আমেরিকা ও ইরানের মধ্য়ে দরকার সমঝোতা

Reuters via ANI

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের প্রথম দিকের পরিস্থিতির সঙ্গে সাম্প্রতিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য চোখে পড়ছে। যুদ্ধের শুরুর সপ্তাহগুলিতে আমেরিকা যখন সমঝোতার জন্য চাপ দিচ্ছিল, তখন ইরান ছিল অনেক বেশি অনমনীয়। এখন পরিস্থিতি যেন উল্টো দিকে ঘুরেছে। গত কয়েক দিনে তেহরানই আলোচনায় বসার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু সেই আগ্রহের জবাবে আমেরিকা এখনও তেমন তাড়াহুড়ো দেখাচ্ছে না।

গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তার পরেই ইরান যুদ্ধ থামানোর জন্য সাত দিনের একটি রূপরেখা প্রস্তাব করলেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর পিছনে আমেরিকার আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনও একটি কারণ হতে পারে। নভেম্বরের নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই তেহরান তার কৌশল সাজাচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্পও চান না, নির্বাচনের চাপকে কাজে লাগিয়ে ইরান তাঁর উপর কোনও বাড়তি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করুক।

তবে ইরানের হাতে থাকা আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টির অস্ত্রও এখন আগের মতো কার্যকর নেই— হরমুজ প্রণালী। যুদ্ধের পর এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক পণ্য ও জ্বালানি পরিবহণে বাধা সৃষ্টি করা ছিল ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র। সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকা আমেরিকার বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ের বদলে তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ব্যবহার করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করতে চেয়েছিল।


কিন্তু সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে পশ্চিম এশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেলের রফতানি আবার বাড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালী এবং বিকল্প পথ মিলিয়ে গত সপ্তাহে যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পরিবহণের প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল তেল সরবরাহ। ফেব্রুয়ারির পর এটাই সর্বোচ্চ। অর্থাৎ হরমুজকে কেন্দ্র করে ইরানের চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা কিছুটা হলেও কমেছে।

সৌদি আরবও তার পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন মেরামত করেছে। ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এই পাইপলাইনটি হরমুজ এড়িয়ে সৌদি তেল পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। পাশাপাশি লোহিত সাগর দিয়ে তেল রফতানিও আবার শুরু হয়েছে বলে খবর। ফলে হরমুজের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। মার্কিন পাল্টা অবরোধের কারণে হরমুজ দিয়ে ইরানের অপরিশোধিত তেল রফতানি কার্যত বন্ধ। অবরোধের বাইরে বিক্রির জন্য যে তেল রয়েছে, তার মজুতও অনন্ত নয়। তার সঙ্গে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতির উপর চাপ বাড়ছে। মূল্যবৃদ্ধি, পণ্য ও জ্বালানির ঘাটতি, বিদ্যুতের সমস্যায় সাধারণ মানুষের জীবনও কঠিন হয়ে উঠেছে।

তবু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনৈতিক দুর্দশা কি ইরানের নেতৃত্বকে রাজনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে? এখনও তার স্পষ্ট প্রমাণ নেই। সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়লেও সেই চাপ যে নেতৃত্বের উপর সিদ্ধান্ত বদলের মতো নির্ণায়ক প্রভাব ফেলছে, এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

অতএব, বর্তমান অচলাবস্থা ভাঙতে হলে শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক চাপের উপর নির্ভর করলে চলবে না। আমেরিকার হাতে যেমন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তির চাপ রয়েছে, তেমনই ইরানের হাতেও এখনও কিছু কৌশলগত অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু উভয় পক্ষই যদি নিজেদের হাতে থাকা চাপের অস্ত্রকে সর্বাধিক ব্যবহারের চেষ্টা করে, তবে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বাড়বে।

শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথেই ফিরতে হবে দু’পক্ষকে। তার জন্য আমেরিকা ও ইরান— উভয়কেই নিজেদের বর্তমান সুবিধার কিছুটা ছাড় দিতে হবে। নইলে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।