ভারত-বাংলাদেশ আলোচনার খসড়া তৈরি করেছিল ঢাকা

Image: IANS

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে ঢাকা যে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তার প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের অভ্যন্তরীণ নথিতে। ওই নথি অনুযায়ী, তারেকের প্রস্তাবিত ভারত সফরের প্রায় এক সপ্তাহ আগে, ১০ আগস্ট থেকেই ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রস্তুতিমূলক নথি তৈরির কাজ শুরু করেছিল বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক। অথচ তার প্রায় এক সপ্তাহ পরেই ঢাকার পক্ষ থেকে বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে ওই সফর না হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। ইউএনআই-এর হাতে আসা বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের অভ্যন্তরীণ নথি থেকেই এই তথ্য সামনে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের দক্ষিণ এশিয়া শাখা ১০ আগস্ট ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত বিবরণ’ শিরোনামে একটি নতুন ও হালনাগাদ নথি তৈরির উদ্যোগ নেয়। মন্ত্রকের বিভিন্ন শাখা ও বিভাগকে বলা হয়েছিল, ১৩ আগস্টের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিতে সাম্প্রতিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় নোট জমা দিতে।

বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত আলোচনার জন্য যে বিষয়গুলির উপর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, তার তালিকা ছিল যথেষ্ট বিস্তৃত। এর মধ্যে ছিল আন্তঃসীমান্ত নদীর জলবণ্টন ও জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতি, সামুদ্রিক বিষয়, বাংলাদেশ-চিন সম্পর্ক, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পরবর্তী পরিস্থিতি এবং টাঙ্গাইল শাড়ির ভৌগোলিক নির্দেশক বা GI স্বীকৃতির মতো বিষয়।

কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট নোটগুলি প্রস্তুত রাখতে হবে। কারণ, আগস্টের শেষ দিকে অথবা সেপ্টেম্বর মাসে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হতে পারে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।এই সম্ভাব্য আলোচনার ক্ষেত্রে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি, যা সাধারণভাবে ফারাক্কা চুক্তি নামে পরিচিত, বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। চুক্তিটির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে চুক্তিটির নবীকরণ, কিংবা প্রয়োজনে সেটিকে নতুন করে সাজানোর বিষয়টি বাংলাদেশের কূটনীতিকদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই অন্যতম প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছিল। প্রস্তুত করা নোটগুলির একটি বড় অংশেই তাই এই চুক্তির বিষয়টি স্থান পেয়েছিল।


তবে শুধু ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়েই প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ ছিল না। নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চিনের সম্পর্কেরও একটি হালনাগাদ মূল্যায়ন চাওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), বাংলাদেশে চিনা বিনিয়োগ এবং চিনের অর্থসাহায্যে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-আমেরিকা সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে ওয়াশিংটনের নীতিরও মূল্যায়ন চাওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, চিন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে আলাদা করে ব্যাখ্যামূলক নোট তৈরির অন্যতম কারণ হতে পারে চিনা বিনিয়োগ সম্পর্কে ভারতের সংবেদনশীলতা। চিন বাংলাদেশের মংলা বন্দর উন্নয়ন এবং তিস্তা নদীর জল সংরক্ষণ প্রকল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে মনে করা হয়। দু’টি প্রকল্পের ক্ষেত্রই ভারতের সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি হওয়ায় নয়াদিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিও বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।

প্রস্তাবিত আলোচনার তালিকায় আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বিষয়ও ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এই সংঘাতের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।এর পাশাপাশি বিভিন্ন বহুপাক্ষিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত ও বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনার সম্ভাব্য তালিকায় রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল BRICS, SAARC, BIMSTEC, কমনওয়েলথ এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ। অর্থাৎ, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল।

অর্থনীতি ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলিও ছিল সম্ভাব্য আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়টি। এই মর্যাদা হারানোর পরে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের উপর আগের তুলনায় বেশি শুল্ক চাপতে পারে। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যের উপর তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা জরুরি হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি টাঙ্গাইল শাড়ির GI স্বীকৃতি এবং বৃহত্তর বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ও প্রস্তুতিমূলক নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

টাঙ্গাইল শাড়ির GI নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে বিতর্ক রয়েছে, তা অর্থনৈতিক দিক থেকে হয়তো খুব বড় কোনও বিষয় নয়। কিন্তু এর সঙ্গে দুই দেশের মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে, ভারতে তৈরি টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য ভারতও স্থানীয় GI স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই এই বিষয়টির প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে ছোট হলেও বিষয়টি দুই দেশের আলোচনায় একটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।

মায়ানমারের পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকটও সম্ভাব্য আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লক্ষ রোহিঙ্গাকে কীভাবে মায়ানমারে ফেরানো যায়, সেই প্রশ্নে চিন, ভারত এবং ASEAN-এর ভূমিকা কী হতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা করার প্রস্তুতি ছিল। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক শক্তিগুলির ভূমিকা এবং মায়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি—দুই বিষয়কেই বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনীতির প্রেক্ষাপটে দেখছিল ঢাকা।

প্রস্তুতিমূলক নথিতে এত বিস্তৃত বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি তাৎপর্যপূর্ণ। এর থেকে স্পষ্ট, তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফরকে শুধু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনা করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল না। বরং দুই প্রতিবেশী দেশের সামনে থাকা কৌশলগত, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সমস্যাগুলি নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা করার একটি সম্ভাবনা হিসেবেই সফরটিকে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

আলোচনার সম্ভাব্য পরিধি দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও বিস্তৃত ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট এবং ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাতকেও আলোচ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও তালিকায় ছিল।

তবে বিদেশ মন্ত্রকের তৈরি করা নথিটি কোনও নির্দিষ্ট আলোচনার অবস্থান বা নীতিগত সুপারিশ নির্ধারণ করেনি। বাংলাদেশের সরকারি সূত্রের বক্তব্য, এটি মূলত ছিল একটি সমন্বিত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ। বিদেশ মন্ত্রকের বিভিন্ন শাখা ও বিভাগকে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রের সাম্প্রতিক তথ্য এবং প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করতে বলা হয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রিফ বা প্রস্তুতিমূলক নথি তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল।

এই প্রস্তুতির সময়কালও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ১০ আগস্ট থেকেই যখন বিদেশ মন্ত্রক তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য বিস্তৃত প্রস্তুতি শুরু করছে, সেই সময়েই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে ঢাকার তরফে তখন যে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল, তা স্পষ্ট।

কিন্তু এর পরেই তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলের একাংশ সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে বিভিন্ন দাবি এবং পূর্বশর্ত সামনে আনতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ভারতের কাছে থাকা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। ফলে তাঁর প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণে একটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের ১০ আগস্ট থেকে শুরু করা প্রস্তুতি দেখিয়ে দেয় যে, তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফরকে ঘিরে ঢাকার পরিকল্পনা ছিল যথেষ্ট বিস্তৃত। জলবণ্টন থেকে বাণিজ্য, চিনের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে রোহিঙ্গা সমস্যা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সহযোগিতা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট—দুই দেশের সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিকই সম্ভাব্য আলোচনার পরিধিতে আনা হয়েছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি, এবং সামগ্রিক কূটনৈতিক পরিবেশ শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পিত সফরের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে।