ডিজিটাল ভারতের অগ্রগতি

প্রতীকী ছবি

প্রযুক্তির প্রকৃত সাফল্য শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট, আধুনিক মোবাইল ফোন কিংবা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর আসল সার্থকতা সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ, স্বচ্ছ ও নিরাপদ করে তোলার মধ্যে। গত এক দশকে ভারতের ডিজিটাল অগ্রগতি এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাঙ্কিং এবং সরকারি পরিষেবার মতো নানা ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সাইবার অপরাধ, আর্থিক প্রতারণা ও ডিপফেকের বিপদও বেড়েছে। তাই ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি মানুষের আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি দিল্লিতে ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেসের দশম অধিবেশনের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বিষয়গুলির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি একদিকে ডিজিটাল ভারতের সাফল্য তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হল, প্রযুক্তির সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে হবে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস অটুট রাখতে হবে।
ভারতের ডিজিটাল অগ্রগতির অন্যতম বড় সাফল্য হল প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা। একসময় উন্নত প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ মূলত শহর এবং সচ্ছল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ডিজিটাল ইন্ডিয়া কর্মসূচি, টেলিকম ক্ষেত্রে সংস্কার এবং যোগাযোগ পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ সেই ব্যবধান কমাতে সাহায্য করেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি জেলায় পৌঁছে গিয়েছে পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল পরিষেবা বা ৫জি। সাড়ে পাঁচ লক্ষেরও বেশি বেস স্টেশনের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের বিস্তার দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের নতুন সুযোগ
তৈরি করেছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল এর সামাজিক প্রভাব। মোবাইল ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, সুপ্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সরকারি পরিষেবা গ্রহণ, অর্থ লেনদেন, ব্যাঙ্কিং এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে ডিজিটাল পরিষেবার আওতায় আনার ফলে শহরে না গিয়েও বহু প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে এবং প্রশাসনিক জটিলতাও কমছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। করোনা অতিমারির সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে বহু পড়ুয়ার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত ‘দীক্ষা’ ডিজিটাল শিক্ষামাধ্যমে পাঁচশো কোটিরও বেশি শিক্ষণ-পর্ব পরিচালিত হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার শিক্ষার সুযোগকে সমাজের বিস্তৃত অংশের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। প্রায় ২৫ কোটি পড়ুয়াকে ডিজিটাল ও অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল ব্যবস্থার আর একটি বড় সাফল্য হল সরকারি আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। সরাসরি উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরকারি অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ৫০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ লক্ষ কোটি টাকার অপচয় বা অনিয়ম আটকানো সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধির মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে চার লক্ষ কোটি টাকারও বেশি পৌঁছনোও এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা তুলে ধরে।
তবে ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাইবার প্রতারণা ও ডিপফেকের সাহায্যে মানুষের পরিচয়, অর্থ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার করা হচ্ছে। এই অপরাধ দেশের সীমানা মানে না। তাই শুধু একটি দেশের উদ্যোগে এর মোকাবিলা করা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী সরকার, প্রযুক্তি সংস্থা, টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রতারণা প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে নাগরিকদের ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তির পরিচয় যাচাই, সন্দেহজনক বার্তা সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং নিরাপদে অনলাইন লেনদেন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকেও ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং প্রতারণা শনাক্ত করার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তোলার উদ্যোগ ভারতের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা বাড়াবে।