গণতন্ত্রের উজ্জ্বল মুহূর্ত

প্রতীকী চিত্র

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এক আশাব্যঞ্জক চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— ভোটারদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু-সহ একাধিক রাজ্যে রেকর্ডসংখ্যক ভোটদানের ঘটনা নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের জন্য এক বড় ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে বিতর্কিত এসআইআর-এর পর এই উচ্চ উপস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ১২ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ পড়া বা তাঁদের ভোটাধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়া নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এই ঘটনায় একদিকে যেমন অনেক নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হন, অন্যদিকে যাঁরা তালিকায় থেকে গিয়েছেন তাঁদের মধ্যে যেন এক নতুন সচেতনতা জন্ম নিয়েছে। সেই সচেতনতারই প্রতিফলন দেখা গেল ভোটকেন্দ্রগুলিতে দীর্ঘ লাইন ও বিপুল উপস্থিতিতে।
তামিলনাড়ুতে ৮৫ শতাংশেরও বেশি ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন, যা সাম্প্রতিক কালের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় শতভাগ ভোটদানের লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এক বিরল ঘটনা। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, মানসিকতার পরিবর্তনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ভোট দেওয়া যে শুধুমাত্র একটি অধিকার নয়, বরং একটি দায়িত্ব— এই উপলব্ধি যেন আরও গভীর হয়েছে।

এই উচ্চ ভোটদানের পেছনে নানা ব্যাখ্যা উঠে আসছে। কেন্দ্রের শাসকদল বলছে, পশ্চিমবঙ্গের সরকারবিরোধী মনোভাব বা ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ই মানুষকে বুথমুখী করেছে। আবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কাই মানুষকে আরও দৃঢ়ভাবে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বাস্তবে হয়তো এই দুইয়ের সংমিশ্রণই কাজ করেছে। তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য— এসআইআর-এর প্রভাব এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।


তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে আরও একটি আকর্ষণীয় উপাদান ছিল অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা সি জোসেফ বিজয়ের প্রভাব। তাঁর দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাঝাগম’ (টিভিকে) প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়েই বিশেষত তরুণ, প্রথমবারের ভোটার এবং মহিলাদের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে। যদিও এই নতুন শক্তি কতটা আসন জিততে পারবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে এটি নিশ্চিত যে, তিনি দীর্ঘদিনের দ্রাবিড় রাজনীতির দুই প্রধান শক্তির সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে তামিল রাজনীতিতে চলচ্চিত্র জগতের প্রভাব ছিল প্রবল, কিন্তু অনেকেই মনে করেছিলেন সেই যুগ শেষ হয়ে এসেছে। সেই ধারণাকে আংশিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন বিজয়। নানা বাধা— যেমন তাঁর বড় বাজেটের চলচ্চিত্র ‘জন নায়াগন’-এর মুক্তি নিয়ে সমস্যার অভিযোগ— সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিক ময়দানে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে সক্ষম হয়েছেন। এটি ভবিষ্যতের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের ইঙ্গিত বহন করে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তুলনামূলকভাবে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেনি তেমন। অতীতে এই রাজ্যে প্রচুর রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা ঘটতে দেখা গিয়েছে । যদিও এবারের নির্বাচনেও উত্তেজনা ছিল, তবু বৃহৎ সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছে। এই পরিবর্তন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।

সব মিলিয়ে, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত রয়েছে মানুষের অংশগ্রহণে। ভোটদানের হার যত বাড়বে, ততই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে, তাদের একটিমাত্র ভোটও গুরুত্বপূর্ণ, তখনই গণতন্ত্র সত্যিকারের অর্থে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে— এই উচ্চ ভোটদানের প্রবণতা কি স্থায়ী হবে? যদি রাজনৈতিক দলগুলি এই বার্তাটি সঠিকভাবে গ্রহণ করে এবং মানুষের আস্থা অটুট রাখার চেষ্টা করে, তবে তা সম্ভব। অন্যথায়, এই উচ্ছ্বাস সাময়িক হয়েই থেকে যেতে পারে।

অতএব, এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ভোটারদের এই বিপুল অংশগ্রহণই প্রকৃত বিজয়ী। এটি প্রমাণ করে যে, সমস্ত বিতর্ক, সংশয় ও বাধা সত্ত্বেও ভারতীয় গণতন্ত্র এখনও জীবন্ত, সচল এবং শক্তিশালী।