গণতন্ত্র বনাম জনতন্ত্র

pic ai

রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চায় ‘গণতন্ত্র’ বা ‘লোকতন্ত্র’ দুটি খুবই পরিচিত ধারণা। সাধারণত এই দুই শব্দ একে অপরের পরিপূরক স্বরূপ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মূলত গণতন্ত্র (বা লোকতন্ত্র) বলতে আমরা সেই রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থাকেই উল্লেখ করে থাকি, যেখানে রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা সাধারণ জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। অর্থাৎ এই শাসন ব্যবস্থায় জনগণই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কাণ্ডারি। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৩ সালের বিখ্যাত গেটিসবার্গ বক্তৃতায় গণতন্ত্রের সবচেয়ে প্রচলিত সংজ্ঞাটি প্রদান করেন “Government of the people, by the people, for the people”, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এমন এক শাসন ব্যবস্থা যা জনগণের দ্বারা, জনগণের সমবায় ও কল্যাণে ও জনগণের শাসনরূপেই পরিচিত।
যদিও গণতন্ত্র ও লোকতন্ত্র উভয়ই একই রাজনৈতিক ধারণাকে প্রকাশ করে এবং প্রায়শই এই দুই শব্দ সমার্থক বা প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবুও এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম প্রায়োগিক পার্থক্যও উল্লেখ্য। শব্দিক উৎসের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে আমরা দেখব গণতন্ত্র শব্দটি ইংরেজি ‘Democracy’-র প্রত্যক্ষ বাংলা অনুবাদ, যা গ্রিক শব্দ ‘Demos’ = জনগণ, ‘Kratos’ = ক্ষমতা থেকে এসেছে। অন্যদিকে, লোকতন্ত্র শব্দটি হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় ‘Democracy’-কে বোঝাতে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর উদ্ভব মূলত ‘লোক’ অর্থাৎ জনসাধারণ এবং ‘তন্ত্র’ অর্থাৎ শাসন থেকে। ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও এদের মধ্যে সামান্য ও সূক্ষ্ম পার্থক্য অনুভব করা যেতে পারে। যেখানে গণতন্ত্র শব্দটি প্রায়শই রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক আলোচনায় বেশি ব্যবহৃত হয়, লোকতন্ত্র শব্দটি সাধারণত লোকায়ত বা তাত্ত্বিক আলোচনায় সাধারণ মানুষের অধিকার বোঝাতে প্রয়োগ হয়। এই সামান্য পার্থক্যটুকু থাকলেও, দার্শনিক স্তরে এই দুই শব্দের মধ্যে এক পরিপূরকের সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, গণতন্ত্র হল শাসন ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, আর লোকতন্ত্র হল এর ভেতরের মূল শক্তি— অর্থাৎ সাধারণ মানুষের শাসন। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, উভয় ধারণারই মূল ভিত্তি হল— জনগণের সার্বভৌমত্ব, অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সম্মতি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, ভোটাধিকার, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় অন্তর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা, আইনের অনুশাসন অর্থাৎ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দেশের আইনই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং রাষ্ট্র বা সমাজের সব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও শাসক গোষ্ঠী আইনের অধীন। তাই সহজে বললে, আমরা বলতে পারি, গণতন্ত্র যদি হয় একটি রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামো, তবে লোকতন্ত্র হল তার ভেতরের সামাজিক ও মানবিক চেতনা। দুই ধারণাই দিন শেষে সাধারণ মানুষের জয়গাথা প্রচার করে।
এরই ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে ‘Mobocracy’ (মবোক্রেসি বা বাংলায় জনতন্ত্রের) ধারণা, যা মূলত উচ্ছৃঙ্খল জনতা কর্তৃক শাসন ব্যবস্থাকে বোঝায়। এর আক্ষরিক বাংলা অর্থ হল দাঙ্গাবাজদের দ্বারা চালিত শাসন, যা আদতে উত্তেজিত জনতার দৌরাত্ম্য। এই ব্যবস্থায় এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে প্রতিষ্ঠিত আইনি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বদলে উচ্ছৃঙ্খল, উত্তেজিত বা স্বহিংস্র জনতা নিজেদের হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়। ফলে সৃষ্টি হয় চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অরাজকতা। এই মবোক্রেসি সৃষ্টির পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে, যেমন— প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অবক্ষয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভুল তথ্য ও গুজব, রাজনৈতিক ফায়দার জন্য রাজনৈতিক কারসাজি, ব্যক্তি স্বাধীনতাহীনতা ও পরিচয়হীনতা এবং সর্বোপরি আইন ব্যবস্থার সর্বাঙ্গীণ অবনতি। এই উচ্ছৃঙ্খল জনতন্ত্রের ঘটনা বর্তমানে বেশ কিছু আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, যেমন ২০২২-২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের, মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক পতনের পরিপ্রেক্ষিতে। এই সময় তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্য ও জ্বালানির ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে গভীর জনরোষ বিশৃঙ্খল গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। আবার ২০২৪-২০২৬ সালে বাংলাদেশেও এমন গণ-অভ্যুত্থানের পরিচয় পাওয়া যায়। ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দেশজুড়ে বিচারবহির্ভূত গণ-সহিংসতার ব্যাপক ঢেউ দেখা যায়।
বর্তমানে ভারতেও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) কাজকর্মকেও এই তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে। প্রথমে ২০২৬ সালের মে মাসে এনইইটি পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়মকে কেন্দ্র করে জেনজি চালিত আন্দোলনটি প্রচার লাভ করে এবং আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, তারা বাধ্য করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে। পরবর্তীতে তারা ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর)-এর মাধ্যমে সমগ্র ভারতের ভোটার তালিকা থেকে অন্যায়ভাবে ১৩ কোটিরও বেশি নাম মুছে ফেলা হয়েছে। সিাজপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এই সরকারবিরোধী আন্দোলনগুলিকে আরও দৃঢ় করার জন্য সমস্ত বিরোধী দলকে একত্রিত হয়ে তাদের সমর্থন দাবি করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস, বাম দল, সমাজবাদী পার্টি, শিবসেনা (ইউবিটি) এবং আপ-সহ অন্যান্য বিরোধী দল এই আন্দোলনের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অবশ্য এই কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তীব্র সমালোচনা করে সরকার বলেছে যে, দেশে অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির ক্ষেত্রে বিদেশি শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে এই কংগ্রেস জনতা পার্টি সর্বাঙ্গীণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সরকারের কাছে এগুলি ‘নেতিবাচক রাজনীতি’ ছাড়া কিছুই নয়। রবিপ্রসাদ-সহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও দলের মুখপাত্ররা জোর দিয়ে বলেছেন যে, এর দ্বারা ‘গণতন্ত্রের মর্যাদা’ বিঘ্নিত হচ্ছে। বিজেপি, সিজেপিকে তাদের মূল বার্তা পরিবর্তনের জন্য চরম উপহাসও করেছে— কারণ যা শুরু হয়েছিল এক শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তা রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে মূলত আম আদমি পার্টির শাখা হিসেবে কাজ করছে। বিজেপি আরও বলেছে যে, উত্তেজনা সৃষ্টি, দিল্লি পুলিশকে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং সরকারকে বদনাম করার জন্য ভুয়ো প্রেসকার্ড, মাইক্রোফোন ও প্রোফাইলের একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছিল, যা গণমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়াই সস্তায় বিক্রি করা হত। বিজেপি মুখপাত্র শাহনওয়াজ হুসেন এবং দলের অন্যান্য নেতারা এই আন্দোলনকে ‘সনাতন বিরোধী’ আন্দোলন আখ্যা দিয়ে বলেন যে, নবরাত্রি, দুর্গাপূজা, দীপাবলি ও ছট পূজার মতো উৎসবের সময় এই ধরনের আন্দোলন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করে।
এখানে উল্লেখ্য, বিজেপি ‘গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক নৈরাজ্যের জবাবে’ ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, জনতন্ত্র দূর করো’ (লোকতন্ত্র বাঁচাও, ভিড়তন্ত্র হটাও) নামে একটি সমগ্র দেশব্যাপী প্রচার অভিযান শুরু করেছে। বিরোধী দলের গণ আন্দোলনকে মোকাবিলা করার জন্য বিজেপির সুসংগঠিত সমাবেশ ও সচেতনতামূলক পদযাত্রার পরিকল্পনা করে নাগরিকদের বিভ্রান্তি রোধে সচেষ্ট হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও পুদুচেরির মতো উপনির্বাচনে এবং রাজ্যসভা নির্বাচনের বিজয়ের পর দলের সভাপতি নিতিন নবীন এবং জাতীয় মুখপাত্র স্মৃতি ইরানি-সহ বিজেপি নেতারা এই ফলাফলকে ‘জনতার শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের যোগ্য জবাব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র
ড. সম্বিত পাত্র দিল্লিতে বিরোধী নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ ও বন্ধের সমালোচনা করে জোর দিয়ে বলেছেন যে, রাস্তার সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টার উপর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিই জয়ী হয়েছে। শেষ অবধি চিরাচরিতভাবে সর্বক্ষেত্রেই শাসকদল জনতন্ত্রের উপর গণতন্ত্রের বা লোকতন্ত্রের জয়গাথাকেই স্বীকৃতি দিয়েছে।