শুধু ভোট দেওয়া নয়, ভিন্নমতই গণতন্ত্রের শক্তি

Photo: File photo

গণতন্ত্র মানেই শুধু ভোট দেওয়া নয়, তার থেকেও বড় বিষয় হল মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমত জানানোর অধিকার। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকরা সরকারের সঙ্গে একমত হবেন, আবার অনেক সময় দ্বিমতও পোষণ করবেন— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দ্বিমত প্রকাশ করার সুযোগ যদি সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।

অনেকেই মনে করেন, ভোটের দিনেই নাগরিকের ভূমিকা শেষ। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ভোট দেওয়ার মাধ্যমে আমরা সরকার নির্বাচন করি, আর তার পরে পাঁচ বছর ধরে সরকারের কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সমালোচনা করা এবং প্রয়োজনে প্রতিবাদ জানানো— এগুলোও নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। এই অধিকার না থাকলে গণতন্ত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

তবে প্রশ্ন হল, কীভাবে এই ভিন্নমত প্রকাশ করা উচিত? শুধুমাত্র ঘরের ভিতরে আলোচনা করে বা ব্যক্তিগত আড্ডায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। বরং শান্তিপূর্ণভাবে, আইন মেনে, জনসমক্ষে প্রতিবাদ করার মাধ্যমেই গণতন্ত্র প্রাণ পায়। ইতিহাস দেখিয়েছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অনেক সময় বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। কারণ এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে এবং সরকারের উপর একটি নৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়।


ভারতের সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে। এই স্বাধীনতার মধ্যেই প্রতিবাদের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। যদিও বাস্তবে এই অধিকার প্রয়োগ করতে গেলে অনেক সময় বাধার মুখে পড়তে হয়। বিভিন্ন রাজ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন বা পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবাদকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটি উদ্বেগজনক প্রবণতা।

সম্প্রতি বম্বে হাই কোর্টের এক বিচারপতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন— শুধুমাত্র সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। এই বক্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্রে সরকার মানেই শেষ কথা নয়। নাগরিকরাই শেষ কথা বলার অধিকার রাখেন। যদি প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে— নাগরিকরা কি তবে স্বাধীন?
ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসও আমাদের অনেক কিছু শেখায়। এই দেশ গড়ে উঠেছে অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে, যার মূল শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। তাই আমাদের সমাজে প্রতিবাদের একটি বিশেষ মর্যাদা থাকা উচিত। যদি সেই মর্যাদা কমতে থাকে, তাহলে তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা। যখনই কোনও সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন অনেক সময় তারা বিরোধী মতকে গুরুত্ব দিতে চায় না। কিন্তু বিরোধী দলে থাকলে আবার তারাই প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে কথা বলে। এই দ্বিমুখিতা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি কোনও এক দলের নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই একটি দুর্বলতা রয়েছে।
আমাদের দেশে ‘ধর্না’, ‘মিছিল’, ‘মোর্চা’— এই ধরনের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। এগুলি শুধু প্রতিবাদের মাধ্যম নয়, বরং সাধারণ মানুষের মতামত জানানোর একটি শক্তিশালী উপায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অহিংস আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই সহিংস আন্দোলনের তুলনায় বেশি সফল হয়েছে। কারণ এতে মানুষের সমর্থন বেশি থাকে এবং হিংসার ঝুঁকি কম থাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রতিবাদ গণতন্ত্রের একটি ‘নিরাপত্তা ভালভ’-এর মতো কাজ করে। মানুষের অসন্তোষ যদি প্রকাশের সুযোগ না পায়, তাহলে তা একসময় বিস্ফোরিত হতে পারে। তাই সুস্থ সমাজের জন্য নিয়মতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আজকের দিনে আমাদের নিজেদেরকেও সচেতন হতে হবে। প্রতিবাদ মানে বিশৃঙ্খলা নয়, আবার নীরবতাও সমাধান নয়। বরং যুক্তি, সংযম এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে মত প্রকাশ করাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক আচরণ।

সুতরাং ভিন্নমত কোনও দুর্বলতা নয়— এটাই গণতন্ত্রের শক্তি। সরকার এবং প্রশাসনের উচিত সেই ভিন্নমতকে সম্মান করা। আর নাগরিকদের উচিত সেই অধিকারকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা। তাহলেই গণতন্ত্র সত্যিকারের অর্থে শক্তিশালী হয়ে উঠবে।