অভিযোগের রাজনীতি

ফাইল চিত্র

দিল্লির আবগারি নীতি মামলা খারিজ হওয়ার রায় নিছক একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; এটি আমাদের গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিল। রাউস অ্যাভিনিউ আদালতের বিশেষ বিচারক জিতেন্দ্ৰ সিং যে ভাষায় সিবিআইয়ের তদন্তকে পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো বলেছেন, তা শুধু একটি মামলার সীমায় আবদ্ধ নয়, এটি তদন্তকারী সংস্থার পেশাগত সততা নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া সংশয়ের প্রতিধ্বনি।

এই মামলায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া-সহ ২১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে সিবিআই। কথিত ‘সাউথ গ্রুপ’-এর কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকার ঘুষের অভিযোগ, হাওলা লেনদেন ও তার নথি— এ সবই আদালতের চোখে টেকেনি। বরং বিচারকের পর্যবেক্ষণ, তদন্ত যেন পূর্বনির্ধারিত উপসংহারকে সত্য প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এই দীর্ঘ সময়ে যাঁরা জেলে কাটালেন, তাঁদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির মূল্য কে দেবে? গণতান্ত্রিক সমাজে ‘অভিযুক্ত’ আর ‘দোষী সাব্যস্ত’— এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আদালত যখন বলছে, প্রাথমিক স্তরেই মামলাটি টেকসই নয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে— তদন্তের মানদণ্ড কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিল?


এই প্রথম নয়। ইতিহাস সাক্ষী, বহুচর্চিত দুর্নীতি মামলার পরিণতি অনেক সময় আদালতে গিয়ে ভেঙে পড়েছে। আশির দশকের শেষভাগে বোফর্স নিয়ে দুর্নীতির প্রচার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সরকারকে তীব্র চাপে ফেলে। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে তিনি ক্ষমতা হারান। কিন্তু দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পরও আদালতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

একইভাবে টুজি-স্পেকট্রাম মামলায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এ রাজা ও কানিমোঝি-সহ সব অভিযুক্ত ২০১৭ সালে বেকসুর খালাস পান। অথচ এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রবল রাজনৈতিক চাপে পড়েছিল। শুধু তা-ই নয়, এরপরই ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি। আদালতের রায়ে যখন বলা হল, অভিযোগ প্রমাণিত নয়, তখন রাজনৈতিক ক্ষতির যাবতীয় চিহ্ন কিন্তু মুছে যায়নি।

দিল্লির আবগারি মামলার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সিবিআই ও ইডির মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অবশ্য সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। কিন্তু যখন একের পর এক বহুল প্রচারিত মামলা আদালতে গিয়ে টেকে না, তখন সন্দেহ ঘনীভূত হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তদন্তের মান। সুপ্রিম কোর্ট একসময় সিবিআইকে ‘খাঁচাবন্দি তোতাপাখি’ বলেছিল। সেই মন্তব্যের অভিঘাত এখনও পুরোপুরি কাটেনি। যদি তদন্ত সংস্থা অনুমান, জল্পনা এবং পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্যের উপর নির্ভর করে মামলা সাজায়, তবে তা কেবল অভিযুক্তদের প্রতিই নয়, বিচারব্যবস্থার প্রতিও আস্থা নষ্ট করে।

গণতন্ত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর লড়াই জরুরি। কিন্তু সেই লড়াই হতে হবে তথ্যভিত্তিক, নিরপেক্ষ এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মানজনক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ দণ্ডাদেশের হার প্রায়শই শক্তিশালী প্রমাণ ও পেশাদার তদন্তের ফল। ভারতে বহু ফৌজদারি মামলায় নিম্ন দণ্ডাদেশের হার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তদন্তের গুণমানই শেষ পর্যন্ত বিচারের ভিত্তি।

দিল্লির রায় তাই দ্বিমুখী বার্তা দেয়। একদিকে, আদালত দেখাল যে বিচারব্যবস্থা এখনও স্বাধীন এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে বিচারের মুখে ঠেলে দিতে রাজি নয়। অন্যদিকে, এটি তদন্তকারী সংস্থার জন্য সতর্কবার্তা— রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে দাঁড়িয়েও প্রক্রিয়াগত শুদ্ধতা ও প্রমাণের দৃঢ়তা বজায় রাখা ছাড়া বিকল্প নেই।

সবচেয়ে বড় কথা, একটি অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও তার রাজনৈতিক অভিঘাত থেকে যায়। জনমনে ‘দুর্নীতির ছাপ’ একবার বসে গেলে আদালতের মুক্তি সেই ক্ষত পুরোপুরি সারাতে পারে না। তাই সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন— তদন্তে নিরপেক্ষতা, প্রসিকিউশনে সততা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ন্যায্যতা।

বফর্স থেকে ২জি, আর এখন দিল্লির আবগারি মামলা— এই ধারাবাহিকতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে– আমরা কি অভিযোগের রাজনীতিতে বিশ্বাসী, নাকি প্রমাণের রাজনীতিতে?