ভারতে আজ যে সমস্যাটিকে আমরা সাধারণভাবে ‘বেকারত্ব’ বলে চিহ্নিত করি, সেটি আসলে ততটা সরল নয়। সমস্যাটি আরও গভীরে— এটি মূলত প্রতিভা, শিক্ষা এবং আকাঙ্ক্ষার অপব্যবহারের সমস্যা। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী ডিগ্রি হাতে নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। এঁদের অনেকেই প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী, যাঁদের পরিবারে আগে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল না। গত তিন দশকে ভারতের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রসার এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর মতো নীতিনির্ধারক সংস্থার ভূমিকার কারণে। বর্ণ ও শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য কিছুটা কমেছে, যা নিঃসন্দেহে সামাজিক অগ্রগতির লক্ষণ।
কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত এখানেই। এই শিক্ষিত তরুণরা যে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, সেটি তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অর্থাৎ, সমস্যা শুধু কাজের অভাব নয়, সমস্যা হলো উপযুক্ত কাজের অভাব। অর্থনীতি এমন পর্যাপ্ত সংখ্যক স্থায়ী ও মানসম্পন্ন চাকরি তৈরি করতে পারছে না, যা এই শিক্ষিত কর্মশক্তির দক্ষতার সঙ্গে মানানসই। ফলত একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে— কম শিক্ষিতদের তুলনায় স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। অর্থনীতিবিদ জোন রবিনসন বহু আগেই এই সমস্যার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক।
এই সমস্যার পেছনে ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশের ধরন বড় ভূমিকা পালন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানের মতো দেশ যেখানে রপ্তানিনির্ভর শিল্পায়নের পথে এগিয়েছে, সেখানে ভারত উদারীকরণের পর থেকে মূলত পরিষেবা খাতের ওপর নির্ভর করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসা প্রক্রিয়া পরিষেবার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বব্যাপী সাফল্য অর্জন করেছে। NASSCOM-এর মতো সংস্থার উদ্যোগে দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পরিষেবা খাত সাধারণত উচ্চ দক্ষতা নির্ভর এবং সীমিত সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি করে, এটি বৃহৎ জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না।
এর ফলে ভারতের অর্থনীতি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন অংশ, যাঁরা স্থায়ী ও ভালো বেতনের চাকরি পাচ্ছেন। অন্যদিকে রয়েছে একটি বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র, যেখানে অধিকাংশ তরুণ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যান, অনেক সময় দীর্ঘদিন কাজের খোঁজ করার পর। তাঁরা বাধ্য হয়ে স্বনিয়োজিত কাজ, গিগ অর্থনীতি বা কম উৎপাদনশীল পেশায় যুক্ত হন। এই প্রক্রিয়ায় তাঁদের প্রাথমিক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ধীরে ধীরে কমে আসে। কিন্তু সেই প্রথম ধাক্কা— বেকারত্বের দীর্ঘ সময়, আয়ের ক্ষতি, আত্মবিশ্বাস কমতে থাকা— তাঁদের জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্রমশ দেখা যাচ্ছে, শিক্ষিত তরুণরাও পারিবারিক পেশায় ফিরে যাচ্ছেন বা সেখানেই থেকে যাচ্ছেন— চাষাবাদ, ছোট দোকান বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। এটি তাঁদের পছন্দের কারণে নয়, বরং বাধ্যতামূলক পরিস্থিতির ফল। আগে যে কাজগুলি প্রধানত নারীরা করতেন এবং যেগুলি অর্থনীতির পরিসংখ্যানে প্রায় অদৃশ্য ছিল, এখন সেখানে পুরুষ শিক্ষিত যুবকরাও যুক্ত হচ্ছেন। এটি উন্নতির লক্ষণ নয়; বরং কর্মসংস্থানের মানের অবনতির পরিচয়।
নীতিনির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া এতদিন মূলত সরবরাহপক্ষকেই গুরুত্ব দিয়েছে, অর্থাৎ আরও শিক্ষা, আরও দক্ষতা, আরও প্রশিক্ষণ। স্কিল ইন্ডিয়া মিশন-এর মতো কর্মসূচি এই লক্ষ্যেই চালু হয়েছে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এতে ধরে নেওয়া হয় যে দক্ষতা বাড়লেই কাজের সুযোগ তৈরি হবে। বাস্তবে, শ্রমনিবিড় শিল্পের বিস্তার ছাড়া শুধুমাত্র দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।এখানে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভারতের জনসংখ্যাগত সুবিধা, যা এতদিন দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, আগামী এক দশকের মধ্যে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।
যদি এই বিপুল তরুণ কর্মশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে এই সম্ভাবনাময় সম্পদই ভবিষ্যতে এক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।সুতরাং মূল প্রশ্নটি হলো, ভারত কেমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়? এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে সুযোগ কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা, যা বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে সক্ষম? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
ভারতের সবচেয়ে শিক্ষিত প্রজন্ম আজ হয়তো একই সঙ্গে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত প্রজন্মে পরিণত হচ্ছে। ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই ডিগ্রির যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এই বাস্তবতা যদি দ্রুত পরিবর্তন না হয়, তবে শিক্ষার প্রসার যে সামাজিক অগ্রগতি এনেছে, তা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না। এখন সময় এসেছে ডিগ্রির মোহ কাটিয়ে বাস্তব দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার।