বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আর শুধু সীমান্তে অস্ত্র ও সেনা মোতায়েনের বিষয় নয়। যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, নজরদারি ব্যবস্থা এবং রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের মতো নতুন বিপদও সামনে এসেছে। এই বাস্তবতার মধ্যে দেশের তিন বাহিনীর জন্য ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাবে প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদের অনুমোদন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, প্রস্তাবিত সরঞ্জামগুলির বড় অংশই দেশীয় শিল্পের কাছ থেকে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ এর উদ্দেশ্য শুধু বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানো নয়, দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করা। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশের উপর নির্ভরতা ভারতের অন্যতম দুর্বলতা। তাই আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা সময়োপযোগী।
স্থলবাহিনীর জন্য প্রস্তাবিত বিভিন্ন সরঞ্জামের মধ্যে রাসায়নিক, জৈবিক, তেজস্ক্রিয় এবং পারমাণবিক বিপদের মোকাবিলায় বিশেষভাবে সক্ষম যান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যুদ্ধে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু গুলি বা বোমার আঘাতেই বিপজ্জনক হবে না; বিষাক্ত পদার্থ বা তেজস্ক্রিয়তার কারণেও সৈন্যদের চলাচল কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সেই বিপদ শনাক্ত করা এবং নিরাপদে অভিযান চালানোর ক্ষমতা তাই অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় দ্রুত সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার জন্য উচ্চগতির যান, মাইন পাতা ও সরানোর বিশেষ ব্যবস্থা, সেতু নির্মাণের প্রযুক্তি এবং অন্যান্য প্রকৌশল সরঞ্জাম বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে দ্রুত সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে এগুলির গুরুত্ব আরও বেশি।
সেনাবাহিনী ও বায়ুসেনার জন্য অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার বা এএলএইচ সংগ্রহের সিদ্ধান্তও যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। হেলিকপ্টার শুধু যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত হয় না। সীমান্তে নজরদারি, আহত জওয়ানদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া, দুর্গম এলাকায় সেনা পৌঁছে দেওয়া এবং রসদ পরিবহন— সব ক্ষেত্রেই এর ভূমিকা রয়েছে। ফলে এই ধরনের বিমানসংখ্যা বাড়লে বাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা বাড়বে।
নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে দেশেই মেরিন গ্যাস টারবাইন তৈরি ও উন্নয়নের পরিকল্পনা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যুদ্ধজাহাজের চালনা ব্যবস্থায় গ্যাস টারবাইনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রযুক্তির জন্য বিদেশের উপর নির্ভরতা থাকলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সরবরাহ-ব্যবস্থায় বাধার সময় সমস্যা দেখা দিতে পারে। দেশীয় প্রযুক্তি তৈরি হলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বায়ুসেনার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্থলভিত্তিক বহুমুখী জ্যামার সংগ্রহও আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ারই প্রমাণ। শত্রুর যোগাযোগ ও রাডার ব্যবস্থা অকার্যকর করে দেওয়া, তথ্যপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা এবং ইলেকট্রনিক ক্ষেত্রে আধিপত্য অর্জন এখন যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রচলিত অস্ত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে এত বড় বিনিয়োগের সঙ্গে সরকারের দায়িত্বও কম নয়। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করাই শেষ কথা হতে পারে না। অতীতে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হয়নি। এর মূল্য দিতে হয় বাহিনীকে।
তাই এই বিপুল অর্থের প্রকৃত সুফল পেতে হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দেশীয় উৎপাদনের নামে যেন নিম্নমানের সরঞ্জাম বাহিনীর হাতে না পৌঁছয়, তাও নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে খরচ নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তির মান এবং সেনাদের বাস্তব প্রয়োজন— এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রতিরক্ষা খাতে শক্তিশালী বিনিয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রকৃত শক্তি শুধু বড় বাজেটের মধ্যে নয়; সময়মতো সঠিক সরঞ্জাম, নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মধ্যেই তার সার্থকতা। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে সুযোগ এসেছে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার। সেই সুযোগ যেন বিলম্ব ও অদক্ষতার কারণে নষ্ট না হয়— এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।