ভারত-উজবেকিস্তান সম্পর্কে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীতর সিদ্ধান্ত

Photo: X

ভারত ও উজবেকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রবিবারের দিনটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকল। তাসখন্দে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর দুই দেশ নিজেদের সম্পর্ককে ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ বা ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা এবং ভারতকে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে ইউরেনিয়াম সরবরাহের ব্যবস্থার পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ভারত-মধ্য এশিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি।

ভারত ও উজবেকিস্তানের সম্পর্ক নতুন নয়। ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বাণিজ্যের দীর্ঘ যোগাযোগ এই সম্পর্কের ভিতকে শক্ত করেছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুরনো বন্ধুত্বকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া জরুরি। সেই দিক থেকেই ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এ উন্নীত হওয়ার সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী মোদী যথার্থই বলেছেন, কৌশলগত অংশীদারিত্বের ১৫ বছর পূর্তির সময় এই নতুন সিদ্ধান্ত একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

এই নতুন অংশীদারিত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি হল এর বিস্তৃত পরিসর। দুই দেশ শুধু বাণিজ্য বা কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে নিজেদের সহযোগিতাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, ডিজিটাল যোগাযোগ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ— প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সম্পর্কটি আরও বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ পাবে।


বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য নির্ভরযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। পরমাণু বিদ্যুৎ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য ইউরেনিয়াম মজুতের অধিকারী উজবেকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহের ব্যবস্থা ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এতে ভারতের পারমাণবিক জ্বালানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।

তবে এই সম্পর্কের গুরুত্ব শুধু ইউরেনিয়ামে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্য এশিয়া বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই অঞ্চলে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। তেল-গ্যাসের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রেও মধ্য এশিয়ার দেশগুলির গুরুত্ব বাড়ছে। ভারত যদি উজবেকিস্তানের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে পারে, তাহলে তা দেশের শিল্প, প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও বাস্তবসম্মত উদ্যোগের দাবি রাখে। লক্ষ্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; বাণিজ্যের বাধা দূর করা, পরিবহণ ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, ব্যাংকিং ও অর্থপ্রদানের সুবিধা বাড়ানো এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। দুই সরকার যদি এই বিষয়গুলিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে, তবে বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়।

এই কারণেই দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ে একটি ‘কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিল’ গঠিত হলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক যৌথ কমিশনকে সচিব পর্যায় থেকে মন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়বে। অর্থাৎ, শুধু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলা নয়, সেই সম্পর্ককে বাস্তব প্রকল্প ও ফলাফলে পরিণত করার জন্য কাঠামোও তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই সম্পর্ককে আরও গভীর করা দরকার। ভারতীয় চলচ্চিত্র, সংগীত, যোগ, আয়ুর্বেদ এবং ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি মধ্য এশিয়ায় আগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে উজবেকিস্তানের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতের মানুষের পরিচয় আরও বাড়তে পারে। ছাত্রছাত্রী, গবেষক, শিল্পী ও পর্যটকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে দুই দেশের সম্পর্ক সরকারি স্তর ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে যাবে।

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশে কোনও দেশের পক্ষেই একা এগিয়ে যাওয়া সহজ নয়। পারস্পরিক স্বার্থ, আস্থা এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে বন্ধু দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করাই সময়ের দাবি। ভারত-উজবেকিস্তানের নতুন ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ সেই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।

এখন মূল কাজ হল ঘোষিত পরিকল্পনাগুলিকে দ্রুত বাস্তবে রূপ দেওয়া। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে। তাহলেই তাসখন্দের এই বৈঠক কেবল কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভারত ও উজবেকিস্তানের মানুষের জন্যও তা অর্থবহ হয়ে উঠবে। দুই দেশের দীর্ঘ বন্ধুত্ব এবার আরও শক্তিশালী, বাস্তবমুখী এবং ভবিষ্যতমুখী অংশীদারত্বে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।