বিচারবহির্ভূত মৃত্যু ও মানবাধিকার কমিশন

পুলিশের হেফাজতে থাকা অভিযুক্তের মৃত্যু, বিশেষত পুলিশের গুলিতে মৃত্যু, কখনওই সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। অপরাধ যত
গুরুতরই হোক, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে পরপর কয়েকটি ঘটনায় পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তদের মৃত্যুর পর সেই পুরনো প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে— অপরাধ দমনের নামে পুলিশ কি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে? একই সঙ্গে রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের তৎপরতা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলি এই বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত এক ব্যক্তির পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে ব্যবসায়ী ও বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় ধৃত সামাউল হক অপরাধস্থল পুনর্নির্মাণের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন। পুলিশের বক্তব্য, অভিযুক্তেরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। আত্মরক্ষার জন্যই পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের বক্তব্যকে যেমন প্রমাণ ছাড়া অস্বীকার করা যায় না, তেমনই পুলিশের দাবি মেনে নিয়ে তদন্ত ছাড়াই ঘটনাকে বৈধ বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। সামশেরগঞ্জের ঘটনায় কয়েক জন স্থানীয় বাসিন্দা গুলির শব্দ শোনেননি বলে দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য পুলিশের বিবরণের সঙ্গে না মেলায় ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। অভিযুক্তের কাছ থেকে কীভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব হল, পুলিশকর্মীদের নিরাপত্তায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না এবং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে গুলি চালানো হয়েছিল— এই প্রশ্নগুলির উত্তর তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই খুঁজতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ। সামাউল হকের মৃত্যুর ঘটনায় কমিশন মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অডিয়ো, ভিডিয়ো, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একইভাবে গাইঘাটার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ঘটনার সত্য উদ্‌ঘাটন এবং দায় নির্ধারণ। তদন্তের ফল প্রকাশ্যে এলে মানুষের আস্থা বাড়বে।
অন্যদিকে, সরশুনায় তিন অভিযুক্তকে খালি গায়ে কোমরে দড়ি বেঁধে জনসমক্ষে ঘোরানোর ঘটনাও পুলিশের আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। কোন আধিকারিকের নির্দেশে এমন করা হয়েছিল, রাজ্য মানবাধিকার কমিশন কলকাতার নগরপালের কাছে তা জানতে চেয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান এই ঘটনাকে দাসপ্রথার সঙ্গে তুলনা করেছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কাউকে প্রকাশ্যে অপমান করা কোনও সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ করা আদালতের কাজ; পুলিশকে আইন মেনে তদন্ত করতে হয়। শাস্তি দেওয়া বা কাউকে হেয় করা পুলিশের কাজ নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ধর্ষণ, খুনের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তের মৃত্যুতে অনেক সময় সাধারণ মানুষের একাংশ স্বস্তি প্রকাশ করেন। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব এবং অপরাধীর শাস্তি না পাওয়ার আশঙ্কা থেকে এমন মনোভাব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে নির্যাতিতার পরিবার যখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকে, তখন দ্রুত শাস্তির দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। কিন্তু পুলিশের গুলিতে মৃত্যু মানেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়। অভিযুক্ত সত্যিই অপরাধী কি না, অপরাধের সঙ্গে অন্য কেউ যুক্ত কি না, তার উত্তর পাওয়ার সুযোগও এতে নষ্ট হতে পারে।
বিচারবহির্ভূত হত্যার বিপদ এখানেই। আজ কোনও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে তার মৃত্যুতে সমর্থন জানানো হলে, আগামী দিনে একই ক্ষমতার অপব্যবহার নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধেও হতে পারে। গণতন্ত্রে পুলিশকে শক্তিশালী হওয়া দরকার, কিন্তু সেই শক্তি আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালানোর পরিস্থিতি সত্যিই তৈরি হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হওয়া জরুরি।

অপরাধ দমনে কঠোরতা এবং আইনের শাসন পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তিই অপরাধ কমানোর কার্যকর পথ।