বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা

ফাইল চিত্র

পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল যুদ্ধবিরতি বা শান্তি-আলোচনার ভাষায় বোঝার চেষ্টা করলে ভুল হবে। উপরিভাগে যতই সংঘাত প্রশমনের কথা শোনা যাক, বাস্তবে এই অঞ্চল ঢুকে পড়েছে এক নতুন ও আরও বিপজ্জনক প্রতিযোগিতায়— যেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে প্রতিরোধক্ষমতা, জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ এবং ভূরাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা। এই সংঘাত আর শুধু ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রতিধ্বনি পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গভীরে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে— এই ঘটনাই ইঙ্গিত দেয় যে, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার সীমা কতটা দূরে সরে গিয়েছে। ইরান আপাতত সংঘাত থামাতে আগ্রহী বলে মনে হলেও, তার বিনিময়ে তারা চায় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং হরমুজ প্রণালীতে তাদের কৌশলগত স্বার্থের স্বীকৃতি। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। তারা শুধু যুদ্ধ থামাতে চায় না; তারা চায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিতে।

এই পার্থক্যই বর্তমান সংকটের মূল। যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে গোলাগুলি থামাতে পারে, কিন্তু যদি রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলিই একে অপরের বিপরীতমুখী হয়, তাহলে শান্তি টেকসই হয় না। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পরিকাঠামো ভেঙে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। অর্থাৎ, তারা এই বিরতিকে শান্তি নয়, বরং একটি সাময়িক বিরাম হিসেবে দেখছে— যেখানে পরবর্তী পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।


অন্যদিকে, ইরান তার দুর্বলতাকে ঢাকতে ভৌগোলিক শক্তিকে কাজে লাগাতে চাইছে। হরমুজ প্রণালী— এই সংকীর্ণ জলপথ এখন এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। সরাসরি সামরিক শক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ইরানের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু তারা জানে যে, এই পথকে অস্থির করে তুলতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করা যাবে।

ফলত, দেখা যাচ্ছে সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়ছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে, এবং পশ্চিমা নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি তারই প্রতিফলন। সংঘাতের চরিত্রও বদলে যাচ্ছে— এটি আর কেবল সামরিক লড়াই নয়; বরং নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণের এক জটিল মিশ্রণ।

এই পরিস্থিতির অভিঘাত বহুদূর বিস্তৃত। ইউরোপ ইতিমধ্যেই জ্বালানি সংকটের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে; নতুন করে অস্থিরতা তাদের অর্থনীতিকে আরও বিপন্ন করতে পারে। চিনের মতো দেশ, যারা পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানির উপর নির্ভরশীল, তারা তাদের বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। আর ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। ভারতের জ্বালানি আমদানির বড় অংশই এই অঞ্চল থেকে আসে। ফলে তেলের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ পড়ে।

তবে এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল— সব পক্ষই নিজেদের অবস্থানে ক্রমশ অনড় হয়ে উঠছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাতকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য বলে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষে এই পরিস্থিতিতে নতি স্বীকার করা মানে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া। ইজরায়েলও মনে করে, ইরানের সক্ষমতা আংশিকভাবে রেখে দিলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এই অবস্থায় আপসের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে বিপদ শুধু পরিকল্পিত যুদ্ধবৃদ্ধির নয়, বরং হঠাৎ ভুল হিসাবের। একটি ড্রোন হামলা, একটি নৌ-সংঘর্ষ, কিংবা একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ— এই ধরনের কোনও ঘটনাই বড় আকারের যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।

আজকের বাস্তবতা তাই স্পষ্ট— বন্দুকের শব্দ কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হতে পারে, কিন্তু তার নীচে যে ভূরাজনৈতিক সংঘাত জমাট বেঁধে উঠছে, তা আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। পশ্চিম এশিয়ার এই নতুন অধ্যায় শুধু আঞ্চলিক নয়— এটি এক আন্তর্জাতিক সংকটের পূর্বাভাস, যার অভিঘাত থেকে কোনও দেশই সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারবে না।