সরকারি স্কুলের সংকোচন: কেন এই পরিবর্তন?

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

একসময় গ্রামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয় ছিল গ্রামের স্বপ্ন দেখার প্রথম ঠিকানা। সকাল গড়াতেই কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, হাতে খাতা আর চোখভরা কৌতূহল নিয়ে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা যে পথ ধরে বিদ্যালয়ের দিকে হাঁটত, সেই পথের শেষেই দাঁড়িয়ে থাকত একটি সাদামাটা সরকারি স্কুল। রঙচটা দেওয়াল ছিল, কোথাও ছিল বেঞ্চের অভাব, বর্ষাকালে ছাদ চুঁইয়ে পড়া জল — এ সবই ছিল নিত্যসঙ্গী; তবু সেই বিদ্যালয়ের দরজা কখনও কোনও শিশুর জন্য বন্ধ থাকত না। ধনী-গরিব, জাতপাত ও ধর্মের বিভাজন পেরিয়ে প্রত্যেক শিশুকে সমানভাবে স্বাগত জানাত সেই অসাধ্য সাধন করা ছোট্ট বিদ্যালয়। অথচ আজ দেশের নানা প্রান্তে সেই পরিচিত দরজাগুলিই একে-একে সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যে উঠোন একসময় শিশুদের কোলাহলে মুখর থাকত, সেখানে আজ নেমে আসছে এক অদ্ভুত নীরবতা।

দেশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে। গত এক দশকে প্রায় চুরানব্বই হাজার সরকারি বিদ্যালয় অস্তিত্ব হারিয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় পঁচিশটি বিদ্যালয় মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। একই সময়ে সরকারি বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমেছে প্রায় দুই কোটিরও বেশি। একসময় দেশের মোট শিক্ষার্থীর সত্তর শতাংশেরও বেশি সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত; আজ সেই হার নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে।

সরকারি বিদ্যালয়ের এই ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ার ঘটনাকে কেবল জনসংখ্যার স্থানান্তর, দ্রুত নগরায়ণ কিংবা জন্মহারের পরিবর্তনের স্বাভাবিক পরিণতি বলে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু বাস্তবের ছবিটি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং উদ্বেগজনক। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ‘যুক্তিকরণ’ (র‍্যাশনালাইজেশন)-এর নামে ধারাবাহিকভাবে বহু সরকারি বিদ্যালয়কে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অথবা কাছাকাছি অন্য বিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে। প্রশাসনের যুক্তি, এতে শিক্ষক, পরিকাঠামো ও সরকারি অর্থের আরও দক্ষ ব্যবহার সম্ভব হবে। তাত্ত্বিকভাবে এই যুক্তিকে অস্বীকার করা কঠিন। কিন্তু নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্তকে কার্যকর ও যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়, কিন্তু বাস্তবের মাটিতে তার রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের অভিঘাত সরকারি নথির পাতায় যতটা সংক্ষিপ্ত, বাস্তব জীবনে তার প্রভাব ততটাই গভীর। একটি বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি ভবনের দরজায় তালা পড়া নয়। এর সঙ্গে বদলে যায় একটি শিশুর প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। যে পথটি এতদিন ছিল অল্প কয়েক মিনিটের— সেটিই হঠাৎ অনেক দীর্ঘ হয়ে ওঠে। অনেক শিশুকে তখন পূর্বের চেয়ে আরও আগে ঘর ছাড়তে হয়; রোদ, বৃষ্টি কিংবা কাদা মাড়িয়ে দূরের বিদ্যালয়ে পৌঁছতে হয়। ছোট্ট একটি শিশুর কাছে কয়েক কিলোমিটার পথ কোনও পরিসংখ্যান নয়, সেটি প্রতিদিনের ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামের নাম। প্রথমে অনিয়মিত উপস্থিতি, তারপর পড়াশোনায় অনীহা, শেষ পর্যন্ত অনেকের ক্ষেত্রেই বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া— এই দীর্ঘ পথচলার শুরুটা ঘটে একটি বিদ্যালয়ের দরজায় তালা পড়ার দিন থেকেই। তাই বিদ্যালয় দূরে সরে যাওয়া মানে শুধু দূরত্ব বাড়া নয়; অনেক সময় একটি শিশুর স্বপ্নও তার নাগালের বাইরে সরে যেতে শুরু করে।


সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ এবং জম্মু-কাশ্মীরে। মধ্য প্রদেশের সরকারি নথিতেই দেখা গেছে, লক্ষ-লক্ষ শিশুর কোনও বিদ্যালয়-সংক্রান্ত নথি নেই। তারা সরকারি বা বেসরকারি বিদ্যালয়ে উভয় বিদ্যালয়ে নেই। যেন শিক্ষা-ব্যবস্থার অদৃশ্য অন্ধকারে হারিয়ে গেছে তারা। বহু জেলায় হাজার-হাজার বিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি প্রায় শূন্য অথবা হাতে গোনা কয়েকজন। এই সংকটের মোকাবিলায় প্রশাসন বাড়ি-বাড়ি যোগাযোগের কর্মসূচি শুরু করেছে, কিন্তু সরকারি মূল্যায়নই দেখাচ্ছে যে, যাদের কাছে পৌঁছনোর কথা ছিল, তাদের বিশাল অংশের কাছেই পৌঁছনো যায়নি।

জাতীয় তথ্যও একই ছবি তুলে ধরে। সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা ক্রমাগত কমেছে, অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। এটি কেবল দুটি পরিসংখ্যানের পার্থক্য নয়; এটি ভারতের শিক্ষা-দর্শনের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। শিক্ষা ধীরে-ধীরে একটি জনকল্যাণমূলক অধিকার থেকে বাজারনির্ভর পরিষেবায় পরিণত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সমাজের প্রান্তিক মানুষ। সরকারি বিদ্যালয় দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যতের একমাত্র সিঁড়ি। তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি, অনগ্রসর সম্প্রদায় এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের অধিকাংশ শিশুই সরকারি বিদ্যালয়ের উপর নির্ভরশীল। বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার অর্থ, অনেক সময় শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কই ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম অভিঘাতটি পড়ে মেয়েদের জীবনে। বিদ্যালয় দূরে সরে গেলে পরিবারের প্রথম সিদ্ধান্ত হয় মেয়েটির পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া। দীর্ঘ পথ, নিরাপত্তার আশঙ্কা, যাতায়াতের খরচ— সব মিলিয়ে তার শিক্ষাজীবন থেমে যায়। একটি বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে কত শত স্বপ্নও যে বন্ধ হয়ে যায়, সেই হিসাব কোনও সরকারি প্রতিবেদনে লেখা থাকে না।

যেখানে বিদ্যালয় টিকে আছে, সেখানেও চিত্র খুব আশাব্যঞ্জক নয়। একজন শিক্ষককে কখনও-কখনও একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে শিক্ষা ব্যক্তিকেন্দ্রিক না হয়ে কেবল উপস্থিতি-নির্ভর আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। আইনে যে মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে— বাস্তবে তার সঙ্গে এই অবস্থার দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতির জন্য দায় কার? রাজ্য সরকার বলছে, সীমিত সম্পদে বিদ্যালয়গুলিকে পুনর্গঠন করা ছাড়া উপায় নেই। কেন্দ্র বলছে, শিক্ষা যেহেতু সমবায় তালিকার বিষয়, তাই মূল দায়িত্ব রাজ্যের। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন ওঠে— যদি প্রতিটি শিশুর জন্য পাড়ার মধ্যে বিদ্যালয়ের অধিকার আইন দ্বারা নিশ্চিত করা হয়ে থাকে, তবে সেই অধিকার রক্ষা করবে কে? শুধু আইন তৈরি করলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
শিক্ষার অধিকার আইন শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার কার্যকর করার শক্তি দেয়নি। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া সহজ নয়। বিদ্যালয় পরিচালন সমিতি বহু জায়গায় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ফলে আইনের ভাষা এবং বাস্তব জীবনের মধ্যে একটি গভীর ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

একটি বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিঘাত স্কুল কক্ষের দরজায় তালা পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই তালার শব্দ ছড়িয়ে পড়ে একটি গ্রামের জীবনযাত্রায়, পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষায় এবং শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে। বিদ্যালয় একটি গ্রামের সম্মুখে পড়াশোনার কেন্দ্রের পাশাপাশি সামাজিক মিলনের স্থান, সংস্কৃতির ধারক এবং আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার প্রথম কর্মশালা। তাই বিদ্যালয় যত দূরে সরে যায়, শিক্ষা ততই মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর শিক্ষা যখন মানুষের নাগালের বাইরে যেতে শুরু করে, তখন দূরে সরে যায় সমান সুযোগের অধিকার, দুর্বল হয়ে পড়ে সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎও অদৃশ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।

ভারতের ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে উঠবে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, পরিকাঠামো এবং সর্বোপরি শিক্ষার সম্মিলিত শক্তির উপর। তবে এই অগ্রগতির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরে— দেশ কি এখনও সেই আদর্শে বিশ্বাস করে, যেখানে একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তানও সমান মর্যাদায় মানসম্পন্ন শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়? সেই বিশ্বাস যদি রাষ্ট্রের নীতিতে, প্রশাসনের সিদ্ধান্তে এবং সমাজের চেতনায় সমানভাবে প্রতিফলিত হয়, তাহলে কোনও বিদ্যালয়ের দরজায় তালা ঝোলানোর আগে বহুবার ভাবতে হবে। কারণ একটি বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ অনেক সময় একটি প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের শব্দ হয়ে ইতিহাসের গভীরে প্রতিধ্বনিত হয়।