বহুপাক্ষিকতার উদ্যোগ ও বিশ্ব রাজনীতি

Photo: বহুপাক্ষিকতার উদ্যোগ (AI)

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও যুদ্ধ, অন্যদিকে বাণিজ্য-সংঘাত, সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা, খাদ্য ও জ্বালানির নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার— সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সামনে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সহযোগিতা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে গড়ে উঠল ‘পার্টনার্স ফর মাল্টিল্যাটারালিজম’ বা P4M। ভারত এই নতুন উদ্যোগের প্রাথমিক সহ-উদ্যোক্তাদের অন্যতম। অস্ট্রেলিয়া, বার্বাডোস, ব্রাজিল, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কেনিয়ার সঙ্গে ভারত এই ঘোষণায় যুক্ত হয়েছে।

P4M-এর মূল উদ্দেশ্য কোনও নতুন শক্তিজোট তৈরি করা নয়; বরং রাষ্ট্রসংঘ-ভিত্তিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। ঘোষণায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রসংঘের সনদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা এখনও অপরিহার্য, কিন্তু বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার সংস্কার দরকার। আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা, শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধের নিষ্পত্তি এবং শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থান— এই নীতিগুলিকেই উদ্যোগটির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এই উদ্যোগে ভারতের অংশগ্রহণ তাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রসংঘের সংস্কার এবং বিশ্বশাসন ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলির বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর P4M সম্মেলনে বলেছেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে এবং বহুপাক্ষিকতাকে এই সময়ে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে। তাঁর বক্তব্যে অংশগ্রহণমূলক আলোচনা ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বিশেষভাবে উঠে এসেছে।


ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। জয়শঙ্কর ‘৪এফ’— খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থ— এর সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। একটি দেশের রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত কীভাবে বহু দূরের দেশেও খাদ্য, জ্বালানি বা সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তার যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে। তাই বিশ্ব বাণিজ্য ও সরবরাহ-শৃঙ্খলকে আরও বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল করার প্রয়োজন রয়েছে। P4M ঘোষণাতেও সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্য, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার এবং ন্যায্য ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু-ন্যায়, মহামারি মোকাবিলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসবাদ— এসব ক্ষেত্রেও কোনও একটি দেশের পক্ষে একা সমাধান সম্ভব নয়। এখানেই বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রয়োজন। নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নিরাপত্তার কাঠামো তৈরির কথাও ভারত বলেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ-ব্যবস্থায় কোনও একটি ‘চোকপয়েন্ট’-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষেও সওয়াল করেছে ভারত।

P4M-এর আর একটি বৈশিষ্ট্য হল এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান— বিভিন্ন অঞ্চলের দেশ এখানে একসঙ্গে রয়েছে। ফলে এটি কেবল কোনও একটি ভূ-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উদ্যোগ হয়ে না থেকে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আলোচনার একটি বিস্তৃত মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।

তবে উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার পর বাস্তব কাজ কতটা হয় তার উপর। শুধু নতুন মঞ্চ তৈরি করলেই বহুপাক্ষিকতা শক্তিশালী হবে না। আন্তর্জাতিক আইন মানা, প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার, ন্যায্য বাণিজ্য, উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ রক্ষা এবং বাস্তব সংকটে দ্রুত যৌথ পদক্ষেপ— এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সহযোগিতা দরকার। ভারতের জন্যও এটি একই সঙ্গে সুযোগ ও দায়িত্ব।

আজকের বিভক্ত বিশ্বে ভারতের স্বার্থ নিহিত একটি স্থিতিশীল, নিয়মভিত্তিক এবং প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়। P4M সেই লক্ষ্য পূরণের একটি নতুন পথ খুলতে পারে। ভারত যদি নিজের জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি উন্নয়নশীল বিশ্বের উদ্বেগগুলিকেও এই মঞ্চে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারে, তবে বহুপাক্ষিকতার পুনর্গঠনে তার কূটনৈতিক ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।