কাঁটার মুকুট

প্রায় এক বছর রাষ্ট্রপতি শাসনের পর মণিপুরে ফের রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তন— এই ঘটনাটি স্বস্তির হলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আশাপ্রদ ছবি এখনও ফুটে ওঠেনি। রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাহারের পর ইয়ুমনাম খেমচন্দ সিংয়ের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কিন্তু এই সরকার এমন এক সময়ে ক্ষমতায় এল, যখন মণিপুরের সমাজ, রাজনীতি ও প্রশাসন— তিনটিই গভীর ক্ষত বয়ে চলেছে। শান্তি ফেরানো, আস্থা পুনর্গঠন এবং আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়া— এই তিনটি চ্যালেঞ্জই একযোগে মোকাবিলা করতে হবে নতুন সরকারকে।

রাষ্ট্রপতি শাসনের সময়ে মণিপুরে কার্যত এক ধরনের শাসনহীনতা তৈরি হয়েছিল। হিংসা থামেনি, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এগোয়নি, অস্ত্রসমর্পণ প্রক্রিয়াও অসম্পূর্ণ থেকেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘জনপ্রিয় সরকার’ গঠনের দাবি রাজ্যের ভেতর থেকেই উঠেছিল। গত বছরের এপ্রিলে এনডিএ-র ২১ জন বিধায়ক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি লিখে সরকার গঠনের দাবি জানান। ফলে বর্তমান সরকার গঠনের পেছনে রাজনৈতিক চাপ এবং নির্বাচনী হিসেব যে বড় ভূমিকা নিয়েছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। মণিপুরে প্রায় এক বছরের মধ্যে নির্বাচন— এই বাস্তবতাই দিল্লিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় করতে বাধ্য করেছে বলেই অনেকের মত।

কিন্তু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা যতই থাকুক, ইয়ুমনাম খেমচন্দ সিং যে উত্তরাধিকার হিসেবে এক কাঁটার মুকুট পেয়েছেন, তা স্পষ্ট। মণিপুর আজ গভীরভাবে জাতিগত বিভাজনে ক্ষতবিক্ষত— মেইতেই ও কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস ও শত্রুতা এখনও তীব্র। কুকি-জো কাউন্সিল ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এই নতুন ক্ষমতাকাঠামোর অংশ হবেন না। অর্থাৎ, রাজ্যের একটি বড় অংশ নতুন সরকারকে এখনও নিজেদের সরকার বলে মানতে প্রস্তুত নয়। গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি অশুভ সংকেত।


এর পাশাপাশি রয়েছে নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট। হিংসাত্মক সময়ে লুট হওয়া ও ছড়িয়ে পড়া অস্ত্র এখনও পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। অস্ত্রহীনতার (disarmament) প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থাকলে শান্তি ফেরানো কেবল কথার কথা হয়ে থাকবে। হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনও শিবিরে— তাদের ঘরে ফেরানো, জীবিকা ফিরিয়ে দেওয়া, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া নতুন সরকারের অন্যতম জরুরি দায়িত্ব। পুনর্বাসন কেবল প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছারও পরীক্ষা।

আরও একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন বিরেন সিং এবং তাঁর অনুগামীরা কি নতুন সরকারের সহযোগী হবেন, নাকি বিরোধিতার পথে হাঁটবেন? দলের ভেতরের এই টানাপোড়েন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দুর্বল করতে পারে। ক্ষমতার পালাবদল হলেও যদি পুরনো দ্বন্দ্ব ও আক্রোশ অক্ষত থাকে, তবে সরকারের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। এই অবস্থায় নতুন সরকারের ‘অ্যাসিড টেস্ট’ একটাই— যত দ্রুত সম্ভব শান্তি ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা। তার জন্য একতরফা সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ। সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলা, প্রকৃত অংশীদারদের আলোচনার টেবিলে আনা— এটাই একমাত্র পথ। প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও নৈতিক সাহস জরুরি।

তবে এর চেয়েও বড় একটি প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে– তা হল, দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। গত তিন বছরে যে নজিরবিহীন হিংসাত্মক ঘটনা, প্রাণহানি ও সামাজিক বিভাজন ঘটেছে, তার জন্য কারা দায়ী? এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যৎ নির্মাণ অসম্ভব। ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি টেকে না— এই সত্য মণিপুরকে মনে রাখতে হবে। দোষী নির্ধারণ ও জবাবদিহি যদি দলীয় পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে না হয়, তবে ক্ষত সারবে না। ইয়ুমনাম খেমচন্দ সিংয়ের সরকার সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়চ্ছে। আগামী নির্বাচনই শুধু নয়, ইতিহাসও এই সরকারের কাজ বিচার করবে। শান্তি ফেরাতে পারল কি না, সমাজকে আবার একসুতোয় বাঁধতে পারল কি না এবং অতীতের রক্তাক্ত অধ্যায়ের মুখোমুখি হওয়ার নৈতিক সাহস দেখাতে পারল কি না— এই তিনটি মানদণ্ডেই মণিপুরের নতুন সরকারের মূল্যায়ন হবে।