সমালোচনা অপরাধ নয়

প্রতীকী চিত্র

গণতন্ত্রের শ্বাসপ্রশ্বাস নির্ভর করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর। সেই স্বাধীনতা যদি কেবল প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা আর স্বাধীনতা থাকে না— তা হয়ে ওঠে আনুগত্য। সমাজমাধ্যমের যুগে এই সত্য আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এখন নাগরিকের কণ্ঠ পৌঁছে যায় সরাসরি জনপরিসরে, মাঝখানে কোনও প্রথাগত সম্পাদকীয় ফিল্টার ছাড়াই। ঠিক এই কারণেই ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে নাগরিকের মতপ্রকাশের সংঘাত বাড়ছে— আর সেই সংঘাতের নিষ্পত্তিতে আদালতের ভূমিকা হয়ে উঠছে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষিতেই তাৎপর্যপূর্ণ তেলঙ্গানা হাই কোর্টের সেই রায়, যা সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টও বহাল রেখেছে। সমাজমাধ্যমে কড়া রাজনৈতিক সমালোচনা বা সরকারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলেই পুলিশ যান্ত্রিক ভাবে এফআইআর দায়ের করতে পারে না— এই স্পষ্ট বার্তা শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং বৃহত্তর নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে এক গুরুত্বপূর্ণ বিচারনৈতিক অবস্থান।

ঘটনার সূত্রপাত জনৈক নাল্লা বালুর এক্স হ্যান্ডলে দেওয়া কিছু পোস্ট থেকে। তেলঙ্গানার শাসক দল কংগ্রেসের সমালোচনা করে তিনি যে মন্তব্যগুলি করেছিলেন, তার জেরে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি এফআইআর দায়ের হয়। পুলিশি সক্রিয়তার এই প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু তেলঙ্গানা হাই কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়— এই পোস্টগুলি বৈধ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই পড়ে। এগুলিকে অপরাধ হিসেবে দেখার কোনও আইনগত ভিত্তি নেই। ফলে এই ক্ষেত্রে ফৌজদারি প্রক্রিয়া চালানো মানেই বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার।


এই পর্যায়েই হাই কোর্ট আরও এক ধাপ এগিয়ে পুলিশ ও বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য একটি আচরণবিধি নির্দিষ্ট করে দেয়। উদ্দেশ্য একটাই— সমাজমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে ঢালাও ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রবণতা রুখে দেওয়া। এই নির্দেশিকাতেই আপত্তি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় তেলঙ্গানা সরকার। তাদের যুক্তি ছিল, হাই কোর্টের নির্দেশিকা পরস্পর-বিরোধী এবং সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়— হাই কোর্টের রায় ও আচরণবিধি খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে এবং তাতে হস্তক্ষেপ করার কোনও কারণ নেই। অর্থাৎ, সমাজমাধ্যমে রাজনৈতিক মতপ্রকাশকে অপরাধের ছাঁচে ফেলার প্রবণতায় শীর্ষ আদালতও কার্যত লাগাম পরাল।

এই রায়ের তাৎপর্য এখানেই শেষ নয়। এর আগেও একাধিক মামলায় দেখা গিয়েছে— সরকারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলেই অভিযুক্তকে ‘দেশবিরোধী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সেইসব ক্ষেত্রেও স্পষ্ট করে দিয়েছে, সরকারবিরোধী মানেই দেশদ্রোহী নয়। গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার নাগরিকের মৌলিক অধিকার— এ কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

সমস্যা হল, প্রশাসনিক স্তরে সেই বিচারনৈতিক বোধ এখনও সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না। সমাজমাধ্যমের একটি পোস্ট, একটি ব্যঙ্গ, বা একটি কড়া মন্তব্যকে ‘আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি’ বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা ক্রমশ বেড়েছে। এর ফলে মতপ্রকাশের উপর এক ধরনের ‘ঠান্ডা সন্ত্রাস’ (chilling effect) তৈরি হয়—যেখানে নাগরিক নিজেই ভাবতে শুরু করেন, কথা বললে বিপদ হতে পারে।

তেলঙ্গানা হাই কোর্টের রায় এবং সুপ্রিম কোর্টের সিলমোহর সেই ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক জরুরি প্রতিরোধ। এই রায় পুলিশকে মনে করিয়ে দেয়— তারা আইনের রক্ষক, ক্ষমতার রক্ষক নয়। একই সঙ্গে প্রশাসনকেও স্মরণ করিয়ে দেয়— এফআইআর গ্রহণ বা অনুমোদন কোনও যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়; তার সঙ্গে যুক্ত আছে সাংবিধানিক দায়িত্ব।

গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য বিচার করতে গেলে কেবল নির্বাচনের দিকেই তাকালে চলে না। দেখতে হয়— ভিন্নমত কতটা নিরাপদ, সমালোচনা কতটা সহনীয়। সেই পরীক্ষায় ভারতীয় গণতন্ত্র আজ নানা প্রশ্নের মুখে। এই রায় সেই প্রশ্নগুলির এক গুরুত্বপূর্ণ উত্তর। অন্তত আদালতের দরজায় এসে নাগরিকের কণ্ঠস্বর যে এখনও সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়নি— এই বার্তাটাই আজ সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।

সমালোচনা অপরাধ নয়। এই সহজ সত্যটি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আদালতকে ধন্যবাদ। এখন দেখার, প্রশাসন সেই শিক্ষা কতটা গ্রহণ করে।