ক্রিকেটের রাজনীতি

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়, খেলাটার নিয়মকানুন যতটা স্পষ্ট, তার পরিচালনা ততটাই অস্পষ্ট। মাঠে যা ঘটছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গোলমাল তৈরি হচ্ছে মাঠের বাইরে— বোর্ডের দপ্তরে, কূটনৈতিক ব্যাখ্যায়, আর পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তের জটিলতায়। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘোষণা সেই বিভ্রান্তিরই নতুন সংযোজন। তারা জানিয়েছে, আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেবে, কিন্তু লিগ পর্বে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলবে না।

প্রথম দৃষ্টিতেই এই অবস্থান তাদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। কারণ, এটি না সম্পূর্ণ বয়কট, না পূর্ণ অংশগ্রহণ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এমন এক সিদ্ধান্ত, যার কোনও বাস্তব ব্যাখ্যা নেই। যদি রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতের বিরুদ্ধে খেলাই অসম্ভব হয়, তবে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়াই বা কেন? আর যদি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণে সমস্যা না থাকে, তবে নির্দিষ্ট একটি ম্যাচকে আলাদা করে বয়কট করার যুক্তি কোথায়?

এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার দিকে তাকালে। জিম্বাবোয়ের বুলাওয়েওতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ভারত ও পাকিস্তান মুখোমুখি হয়েছে। সেটিও আইসিসির টুর্নামেন্ট, সেটিও বিশ্বকাপ, এবং সেটিও নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। সেখানে পাকিস্তানের কোনও আপত্তি ছিল না। তাহলে সিনিয়র দলের ক্ষেত্রে এই দ্বিচারিতা কেন? একই দেশের ক্রিকেটে দুই রকম নীতি কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন অনুচ্চারিতই থেকে যাচ্ছে। পাকিস্তান যদি লিগ ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে না খেলে, তবে নকআউট পর্বে দুই দল মুখোমুখি হলে কী হবে? সেখানেও কি ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়াবে তারা? নাকি তখন হঠাৎ ‘খেলার স্বার্থে’ অবস্থান বদলাবে? এই অনিশ্চয়তা শুধু দর্শক বা সম্প্রচারকারীদের নয়, গোটা টুর্নামেন্টের কাঠামোকেই অস্থির করে তোলে।


এই সংকটের সূত্রপাত অবশ্য বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত থেকে, যারা ভারতে খেলতে অস্বীকার করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল ভারতীয় বোর্ডের একটি বিতর্কিত পদক্ষেপ— আইপিএলের একটি দলকে নির্দেশ দেওয়া, যাতে তারা তাদের বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ছেড়ে দেয়। এখানেই প্রশ্ন ওঠে, আইসিসি ঠিক কতটা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে পরিস্থিতি সামাল দিতে? কার্যত কিছুই নয়। ফলে একের পর এক দেশ নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে, আর আইসিসি দাঁড়িয়ে থেকেছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়।

এই নীরবতার ফল আগেও দেখা গিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ক্ষেত্রে ভারত পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকার করেছিল, এবং শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টের ম্যাচ সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ভারতের সিদ্ধান্ত বোঝা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই বিশেষ সুবিধা কেন একমাত্র ভারতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হল? বাংলাদেশ যখন ভারতে খেলতে চায়নি, তখন সেই নমনীয়তা কেন দেখানো হল না?

আইসিসি এই প্রশ্নের কোনও পরিষ্কার উত্তর আজও দেয়নি। বরং সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যেই তারা বলেছে, ‘নির্বাচিত ম্যাচে অংশগ্রহণ বিশ্ব ক্রীড়ার মৌলিক নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’ বক্তব্যটি কাগজে-কলমে নিঃসন্দেহে সঠিক। কিন্তু বাস্তবে আইসিসিই তো দীর্ঘদিন ধরে এই নির্বাচিত অংশগ্রহণকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ থাকা, নির্দিষ্ট দেশে না খেলা— সবই তাদের অনুমোদনেই ঘটেছে।

সবচেয়ে আত্মঘাতী অবস্থানটি অবশ্য পাকিস্তানের। এই সংকট তারা তৈরি করেনি, তবু তার সবচেয়ে চরম প্রতিক্রিয়া তারাই দেখাচ্ছে। এর আর্থিক পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ইভেন্ট— ব্রডকাস্টিং রাইটস, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ। এমন একটি ম্যাচ বয়কট করা মানে পাকিস্তানের ক্রিকেট অর্থনীতির নিজের পায়ে কুড়ুল মারা। যে বোর্ড আগেই আর্থিক চাপে রয়েছে, তাদের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত আরও বিপজ্জনক। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে খেলাটার চেয়ে রাজনীতি বড় হয়ে উঠছে, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যত অসহায়।

আইসিসি যদি সত্যিই বিশ্ব ক্রিকেটের বিশ্বাসযোগ্য অভিভাবক হতে চায়, তবে তাকে স্পষ্ট নিয়ম, সমান আচরণ এবং দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। না হলে এই অনিশ্চয়তা শুধু একটি টুর্নামেন্টকে নয়, গোটা খেলাটার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই নষ্ট করবে।