ডা. বাসুদেব দত্ত
অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে আজ শপথ গ্রহণকারী অপেক্ষারত মন্ত্রীদের দপ্তর বন্টন করা হল। ডা. শারদ্বত মুখার্জীকে স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হলো। সমাজমাধ্যমে অভিনন্দনের বন্যা। প্রথমেই সাংবাদিকদের প্রতিবছর প্রাকপূজো ডেঙ্গি নিয়ে অবাঞ্ছিত মুখরোচক খবর করা নিয়ে শ্লেষাত্মক মন্তব্য এবং জনগণের জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে সরকারের ঘাড়ে সমস্ত দায় চাপিয়ে দেওয়ার কথা সঠিকভাবেই ব্যক্ত করেছেন। আরও অনেক আশার বাণী শুনিয়েছেন৷
তবে একজন ডাক্তারের হাতে স্বাস্থ্য দপ্তরের ভার তুলে দেওয়ায় তরুণ চিকিৎসকরা উল্লসিত এবং আপ্লুত। অনেক তরুণ ডাক্তাররা হয়তো ভাবছেন, ডাক্তার মন্ত্রী তাই ডাক্তারদের স্বার্থ অর্থাৎ হাসপাতালে হামলাবাজির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান, কাজের পরিবেশ, কাজের সময়সীমা ইত্যাদি তাদের দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়ার একটা সুরাহা হবে। বিগত পনের বছরে কোনও ডাক্তারকে স্বাস্থ্য দপ্তরের ভার দেওয়া হয়নি। মমতা বন্দোপাধ্যায় নিজেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, পেশায় আইনজীবী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়েছেন৷ যদিও তাঁর দলে একাধিক ডাক্তার বিধায়ক ছিলেন।
মন্ত্রীসভায় চিকিৎসক মন্ত্রীদের মধ্যে থাকা, ডা. সুদর্শন ঘোষ দস্তিদারকে পরিবেশ, ডা. নির্মল মাজিকে শ্রমদপ্তরের প্রতিমন্ত্রী, ডা. সুকুমার হাঁসদা আদিবাসীকল্যাণ এবং ডা. শশী পাঁজাকে নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী করে রেখেছিলেন।
বিগত বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই, ননী ভট্টাচার্য, রামনারায়ণ গোস্বামী, প্রশান্ত শূর, অধ্যাপক পার্থ দে প্রমুখ অ-ডাক্তার স্বাস্থ্যমন্ত্রীরাও তেমন সাফল্য পাননি। ডাক্তারদের মধ্যে একমাত্র সূর্যকান্ত মিশ্র অল্প কিছুদিনের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং সমস্যা কোথায় বুঝতে পেরেও কিছু পদক্ষেপ করার আগেই তাঁর সরকারের পতন ঘটেছিল। কংগ্রেস শাসনকালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬, ব্যারিস্টার অজিত পাঁজা স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসাবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁর আমলেই অরাজনৈতিক ডাক্তার সংগঠন হেলথ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে ডাক্তার নিয়োগের দাবি তোলা হয়েছিল। সে দাবি গ্রাহ্য হয়নি। যদিও এই প্রতিবেদকের মতে কারিগরি দপ্তরে যোগ্য মেধাবী ডাক্তার ও আমলা যৌথভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার আবশ্যিকতায় বিশ্বাসী। ডাক্তারদের মধ্যে থেকে কাউকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করার পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তি আছে।
অনেকে মনে করেন, ডাক্তার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হলে তাঁদের পরিচিত বহু ডাক্তার বিশেষ সুবিধা পেয়ে যেতে পারেন বা কোনও ডাক্তার অপরাধ করেও পার পেয়ে যেতে পারেন। কিন্তু নবীনদের ধারণা নেই যে, রাজনীতি করা ডাক্তারদের কাছে, রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে, দল আগে, পেশা পরে। রাজনৈতিক কর্তাদের দেখানো পথেই ডাক্তারদের চলতে হয়, অন্যথায় বিদায়।
স্বাস্থ্যপ্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার বলেছেন, হাসপাতালে দালালচক্র কীভাবে ভাঙতে হয়, তিনি জানেন। পশ্চিমবঙ্গের আপামর জনগণ কিন্তু সন্দিহান, এই অসম্ভবকে কীভাবে সম্ভব করবেন? কোনও অসৎ চক্রে কোনও ডাক্তার যুক্ত থাকলে শাস্তি দিতে পারবেন তো? ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত ডাক্তারদের আন্দোলন প্রশাসনের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল নিজেদের বশংবদ ডাক্তার সংগঠন তৈরি করে অবস্থা সামাল দিয়েছিল, বদলি ও দমনপীড়ন চালিয়ে কিছুটা ফ্যাসিস্ট কায়দায়। পরবর্তী সরকার আরও কয়েক একধাপ এগিয়ে ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করে, অভয়াকাণ্ড ঘটিয়ে সেটা সারা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছিল।
চাকরি ক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চিত ডাক্তারদের স্বাভাবিক কারণেই বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে কিছু অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন। প্রাইভেট প্র্যাকটিসের দিকে মনোনিবেশ করা ছাড়া কোনও বিকল্প পথের সন্ধান নেই। সমস্যা হল বদলি ঠেকাতে প্রায় সব ডাক্তারদের শাসকশ্রেণির সঙ্গে আপস করে চলতে হচ্ছিল। নিন্দুকেরা বলছে, বিজেপি সরকারকেও ওই মডেল অনুসরণ করে চলতে হবে।
কিছু নেতিবাচক কথা বললেও আপনাদের ওপর জনগণ এখনও আস্থাভাজন, কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর সূচনা অত্যন্ত ইতিবাচক। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যখাতে মোট জিডিপির ১.৫ শতাংশের পরিবর্তে অন্তত বেশ কয়েক শতাংশ না বাড়ালে এবং বুনিয়াদী স্বাস্থ্যে অগ্রধিকার না দিলে হাল ফেরানো খুব কঠিন। স্বাস্থ্যে প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন। সিভিল সার্ভিসের সমতুল্য ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিস চালু করা, সম্পূর্ণ নন-প্র্যাকটিসিং করা এবং কেন্দ্রীয় হারে বেতনের প্রর্বতন ইত্যাদি কিছু প্রস্তাব রাখলাম, যেদিকে নজর দেওয়া আশু প্রয়োজন। আমরা আশাবাদী এবার স্বাস্থ্যদপ্তরের হাল ফিরবে।