জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য নতুন করে মনে করিয়ে দিল— গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাই শেষ কথা। শ্রীনগরের শের-ই-কাশ্মীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’-এর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ গাওয়া নিয়ে কংগ্রেস জোটের সঙ্গে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেও এই মৌলিক সত্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানটি নিছক একটি রাজনৈতিক সভা ছিল না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দুই রাজ্যপাল, জম্মু ও কাশ্মীরের উপরাজ্যপাল, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ হাই কোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এবং তাঁর পিতা ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের সভাপতি ফারুক আবদুল্লা। ফলে সরকারি অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা ও রাষ্ট্রের নির্ধারিত বিধি মেনে চলার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশন কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, সরকার তার আইনগত ও বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালন করেছে। ন্যাশনাল কনফারেন্স রাজনৈতিক দল হিসেবে গানটির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণ করেনি— এ কথাও তিনি অস্বীকার করেননি। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক দলের অবস্থান এবং সরকারের আইনগত দায়িত্ব এক বিষয় নয়।
এই পার্থক্যটি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দল নানা বিষয়ে নিজস্ব মত রাখতে পারে। সেই মতের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিও থাকতে পারে। কিন্তু কোনও দল যখন সরকার পরিচালনা করে, তখন তাকে দলীয় পছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, আইন এবং রাষ্ট্রের বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। ওমর আবদুল্লার বক্তব্যে সেই দায়িত্ববোধেরই প্রকাশ ঘটেছে।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘বন্দে মাতরম্’ ও জাতীয় সংগীত সংক্রান্ত যে বিধান রয়েছে, তা শুধু জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য নয়, দেশের সর্বত্র প্রযোজ্য। অর্থাৎ বিষয়টিকে কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চল, সম্প্রদায় বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার পরিবর্তে সর্বভারতীয় আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
এই দৃষ্টিভঙ্গি উত্তেজনা কমাতেও সাহায্য করতে পারে। জাতীয় প্রতীক বা দেশাত্মবোধের সঙ্গে যুক্ত কোনও বিষয় যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আবেগ তীব্র হয়। অথচ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে নির্ধারিত নিয়ম পালনকে যদি দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখা যায়, তাহলে বিতর্ক অনেকটাই সহজ হয়ে আসে। সরকারের কর্তব্য আইন পালন করা, রাজনৈতিক দলের কর্তব্য জনগণের কাছে নিজের মত ব্যাখ্যা করা। দুই ক্ষেত্রকে এক করে ফেললে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত তৈরি হয়।
কংগ্রেসের আপত্তি নিয়েও মুখ্যমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, তার মধ্যে সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে। কোনও আইন নিয়ে রাজনৈতিক আপত্তি থাকলে তার পরিবর্তনের পথ সংসদ ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। আইন কার্যকর থাকার সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সেই আইন মানতে হয়— এটাই আইনের শাসনের স্বাভাবিক অর্থ।
ভারতের মতো বহুত্ববাদী দেশে জাতীয় ঐক্য রক্ষার জন্য পারস্পরিক সম্মান ও সংবেদনশীলতা অত্যন্ত জরুরি। ‘বন্দে মাতরম্’ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে গভীর আবেগ ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে দেশের নাগরিকদের নানা ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই জাতীয় প্রতীককে সম্মান করার পাশাপাশি মতের বৈচিত্র্যকেও সম্মান করা দরকার।
ওমর আবদুল্লার বক্তব্যের ইতিবাচক দিক এখানেই— তিনি নিজের দলের অবস্থান গোপন না করেও সরকারের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। রাজনৈতিক মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের আইন সবার জন্য সমান— এই বার্তাই তিনি দিয়েছেন।
ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচনে নয়; তার শক্তি আইন মেনে চলা, মতপার্থক্যকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার মধ্যেও নিহিত। শ্রীনগরের এই ঘটনাকে তাই গণতান্ত্রিক পরিণতিবোধের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। রাজনৈতিক মত আলাদা থাকুক, কিন্তু রাষ্ট্রের কর্তব্য ও আইনের মর্যাদা যেন সবার ঊর্ধ্বে থাকে— এই নীতিই শেষ পর্যন্ত দেশের ঐক্য ও গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।