পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের প্রাক্কালে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত অসঙ্গতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়— এটি সরাসরি গণতন্ত্রের মূল আদর্শ, সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের উপর আঘাত হানছে। প্রায় ৭.৬৬ কোটি ভোটারের মূল তালিকা থেকে প্রায় ১২ শতাংশ নাম বাদ পড়া এবং প্রায় ২৭ লক্ষ নাম ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’-এ রেখে তালিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের সংবিধানের আর্টিকল ৩২৬ স্পষ্টভাবে বলে যে, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক, নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার অধিকার রাখেন। একইসঙ্গে আর্টিকল ৩২৪ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের উপরই ন্যস্ত রয়েছে ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ দায়িত্ব। এই দুই সাংবিধানিক বিধান মিলিয়ে একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়— গণতন্ত্রের ভিত্তি হল অন্তর্ভুক্তি, বর্জন নয়।
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে, তা এই নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর নামে তাড়াহুড়ো করে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে লক্ষ লক্ষ নাগরিক তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার মুখে। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা তথ্যগতঅসঙ্গতির মতো অস্পষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ যুক্তিতে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। যদিও পরে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ আপত্তি জানান, তবুও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময় ২৭ লক্ষ নাম এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়ে গেছে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, এই ২৭ লক্ষ মানুষ কি নাগরিক নন? তাঁদের কি ভোটাধিকার নেই? যদি থাকে, তবে তাঁদের অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা কতটা ন্যায়সঙ্গত?
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা নষ্ট করতে পারে। কারণ, ভোটাধিকার কেবল একটি অধিকার নয়; এটি নাগরিকত্বের অন্যতম প্রধান পরিচয়। এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানে একজন নাগরিককে কার্যত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া।
এখানে আরও উদ্বেগজনক হল সময়সীমার অস্বাভাবিক চাপ। ফেব্রুয়ারির শেষে খসড়া তালিকা প্রকাশ এবং এপ্রিল-মে নির্বাচনের সময়সূচি মাথায় রেখে দ্রুততার সঙ্গে সংশোধন প্রক্রিয়া চালানো— এই পুরো প্রক্রিয়াটি যেন পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের তাড়নায় পরিচালিত হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আদালত যদিও নির্বাচন কমিশনকে প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে, তবুও ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র যুক্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গে এই যুক্তির অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করেছে। এমনকি বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের সহায়তা দিয়ে অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাতেও সমস্যার মূল সমাধান হয়নি— কারণ এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ চূড়ান্ত তালিকার বাইরে থেকে গিয়েছেন।
এখানে একটি মৌলিক নীতি স্মরণ করা জরুরি— ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ‘burden of proof’ বা প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর বর্তায়, নাগরিকের উপর নয়। যদি কোনও নাগরিককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে তার যথার্থ কারণ প্রমাণ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নাগরিককে নিজের বৈধতা প্রমাণ করতে বাধ্য করা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপের দাবি অমূলক নয়। সংবিধান রক্ষা, সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত। একইভাবে সর্বোচ্চ আদালতেরও দায়িত্ব মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখা। যদি নির্বাচনের আগে এই সমস্যার সমাধান না হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে।
গণতন্ত্রের শক্তি তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে। সেখানে কোনও নাগরিক যেন প্রশাসনিক ত্রুটি, প্রযুক্তিগত বিভ্রাট বা তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে বাদ না পড়েন— এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। অন্যথায় নির্বাচন একটি প্রহসনে পরিণত হতে পারে, যেখানে ভোটার থাকলেও ভোটাধিকার থাকে না।
অতএব, নির্বাচন কমিশনের উচিত অবিলম্বে এই প্রক্রিয়ার পুনর্মূল্যায়ন করা, বাকি অভিযোগ দ্রুত ও ন্যায্যভাবে নিষ্পত্তি করা এবং নিশ্চিত করা যে, কোনও যোগ্য নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। কারণ, গণতন্ত্রের ভিত্তি কেবল নির্বাচন নয়— বরং সেই নির্বাচনে সকলের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।