শোভনলাল চক্রবর্তী
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক সূচকের প্রয়োজন হয় দারিদ্র্য সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য জানতে। কোনও সূচক অপর একটি সূচকের বিকল্প হতে পারে না। অতএব ব্যয়ক্ষমতা-ভিত্তিক দারিদ্র্য পরিমাপকে এড়ানো উচিত নয়। ইতিপূর্বে পারিবারিক ভোগব্যয় সমীক্ষা (এইচসিইএস) নিয়মিত প্রকাশিত হত, এবং তার ভিত্তিতে দারিদ্র্য নিরূপণ হত। আক্ষেপ, ওই সমীক্ষার তথ্য বহু দিন হাতে আসেনি। সাম্প্রতিকতম সমীক্ষা (২০২২-২৩) প্রকাশিত হলেও, তার ভিত্তিতে দরিদ্রের অনুপাতটি জানা যায়নি। শেষ প্রকাশিত তথ্য (২০১১-১২) অনুসারে ভারতে দারিদ্র্য ২৭ কোটি, যদিও সরকার বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে খাদ্যশস্য দিচ্ছে ৮১ কোটি মানুষকে।
এমন নানা সংখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে ভারতে দরিদ্রের ছবিকে ঝাপসা করে দিতে চায়। সত্য বস্তুটি সরকারকে বিব্রত করতে পারে, তাই সংখ্যার এত কারসাজি। দারিদ্র্যসীমা নিয়ে রাজনীতির খেলা নতুন নয়। ২০১৪ সালে যোজনা কমিশন ঘোষণা করেছিল, ইউপিএ আমলে জনসংখ্যায় দরিদ্রের অনুপাত ৩৭ শতাংশ (২০০৪-০৫) থেকে কমেছে ২২ শতাংশে (২০১১-১২)। তখন বিজেপি অভিযোগ করেছিল, দারিদ্র্যের সংজ্ঞা বদলে দিয়ে দারিদ্র্য কমাচ্ছে ইউপিএ সরকার। আজ বিজেপি সরকার দারিদ্র্যের সূচকই বদলে দিচ্ছে।
দারিদ্র্যের যে বহুমুখী সূচক ব্যবহার করে রাষ্ট্রপুঞ্জ, তাতে রয়েছে দশটি বিষয়। বিজেপি সরকার যোগ করেছে আরও দু’টি— ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, এবং প্রাক্-প্রসব পরিষেবা। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে ব্যাঙ্কগুলি জনধন অ্যাকাউন্ট খোলায় অধিকাংশ ভারতীয়ের এখন অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যদিও তাতে টাকা রয়েছে শূন্য, বা সামান্য। অন্যদিকে, আশা-অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দিয়ে প্রাক্-প্রসব পরিষেবা বিস্তৃত করা হলেও প্রসূতি মৃত্যুর হার কমেনি। নবজাতকের ওজনে ঘাটতি, শিশু-অপুষ্টি প্রভৃতির জাতীয় হারেও উন্নতি হয়নি। তা সত্ত্বেও দারিদ্র্য নিরসনে ‘উন্নতি’ দেখাতে পারছে সরকার। যেন পরীক্ষার্থী নিজেই নিজের প্রশ্নপত্র তৈরি করছে, নিজেই মূল্যায়ন করছে।
এমন সরকারি পরিসংখ্যান স্বয়ং সরকারও কাজে প্রয়োগ করতে পারে না। নীতি আয়োগের মতে দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছেন একশো জনে চার জন, অথচ সরকারি ভর্তুকিতে খাদ্যশস্য পাচ্ছেন একশো জনে ষাট জন। মহিলাদের সরকারি অনুদান দেওয়ার প্রচলন বাড়ছে। কারণটা বোঝা সহজ, কোন রাজনৈতিক দল দরিদ্রের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে টিকে থাকতে পারে? ভারতে অতি-দরিদ্রের অনুপাত আগের চেয়ে কমছে, তা বিশ্ব ব্যাঙ্ক-সহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থাও স্বীকার করে। কিন্তু যে বিপুল হ্রাস দাবি করছে কেন্দ্র, কোনও মূল্যায়নে তার স্বীকৃতি মেলে না। ভারতের ১৫ শতাংশ মানুষ এখনও মাসে পাঁচ হাজার টাকার কম আয় করেন, এ-ও কিন্তু সরকারি সমীক্ষারই (এসইসিসি) পরিসংখ্যান। ভারতে কত মানুষ গরিব?
বিশ্ব ব্যাঙ্কের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট (২০২৪-২৫) বলছে, ভারতে চরম দারিদ্র্য (‘একস্ট্রিম পভার্টি’) অনেকটাই কমেছে। দৈনিক ৩ আমেরিকান ডলার বা তারও কম ব্যয়ক্ষমতায় বেঁচে রয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ (২০১১-১২) থেকে নেমেছে ৫.৩ শতাংশে (২০২২-২৩)। এই হিসাবে সাড়ে সাত কোটি ভারতীয় এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, দারিদ্র্য মাপার এই পদ্ধতি কি ঠিক? দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্রসীমা কোনও মতে বেঁচে থাকাকে বোঝায়, তাই একে দারিদ্র্যের সংজ্ঞা ধরলে এমন বহু মানুষ বাদ পড়ে যাবেন, যাঁদের যথেষ্ট আহার জোটে না, আবাস নেই, শিক্ষা বা চিকিৎসার নাগাল যাঁদের নেই।
অসুস্থতা, কর্মহীনতা বা মূল্যবৃদ্ধির জন্য যে কোনও মুহূর্তে তাঁরা ফের চরম দারিদ্র্যে পিছলে যাবেন। এঁদের ‘দরিদ্র্য’ বলে না ধরলে দেশ কী করে দারিদ্র্যের প্রকৃত ছবি তৈরি করতে পারবে? গরিব মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় দারিদ্রের সংজ্ঞা এক রকম— বর্ধমানের বিঘড়া-বামুনিয়ার গ্রামবাসীরা গ্রাম উন্নয়নের পরিকল্পনা (২০০২) করতে গিয়ে স্থির করেছিলেন, যে পরিবারের প্রত্যেক দিন পেট ভরে খাবার নিশ্চয়তা আছে, এবং স্নান করে উঠে পরার মতো অন্তত আর এক প্রস্থ শুকনো কাপড় রয়েছে, সেই পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার উপরে বলা যেতে পারে।
কিন্তু অর্থনীতিতে এমন সংজ্ঞা চলে না, সেখানে প্রয়োজন সংখ্যা। বিশ্ব ব্যাঙ্ক নানা মাপ ধরে গরিবের নানা সংখ্যা নির্ণয় করেছে। যেমন, ভারতের মতো নিম্ন থেকে মধ্য আয়ের দেশের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য পরিমাপ হল দৈনিক ৪.২০ ডলার ব্যয়ক্ষমতা। তা দিয়ে বিচার করলে জনসংখ্যার ২৩.৯ শতাংশই দরিদ্র। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, তা হলে গরিবের সংখ্যা ৭.৫ কোটি, না কি ৩৪.২ কোটি? কোন সংখ্যাটি ভারতে দারিদ্র্যের প্রকৃত চিত্রকে তুলে ধরে? দরিদ্রের সংখ্যা নিয়ে সংশয়ের তত গুরুত্ব থাকত না, যদি না কেন্দ্রীয় সরকার মানুষের আয় কিংবা ব্যয়ক্ষমতা ধরে দারিদ্র্য নিরূপণের কাজটি এড়িয়ে যেত।
এখন দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক সূচকের (মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইন্ডেক্স) ভিত্তিতে তথ্য জোগাচ্ছে সরকার। গত দু’বছরে লোকসভা এবং রাজ্যসভায় দরিদ্রের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বহু বার প্রশ্ন উঠেছে। সরকার হয় নিরুত্তর থেকেছে, না হলে জানিয়েছে যে, দারিদ্র্য মাপতে বহুমাত্রিক সূচকটিই কেবল ব্যবহৃত হচ্ছে।
বহুমাত্রিক সূচকটি জরুরি, কারণ তা দিয়ে বোঝা যায় যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাস, শৌচাগার-সহ মৌলিক পরিষেবাগুলি মানুষ কতখানি ব্যবহার করছেন। এর ফলে নীতি তৈরির কাজে সুবিধে হয়, কারণ সরকার বুঝতে পারে কারা এই সুবিধাগুলো থেকে বাদ পড়ছেন, কেন বাদ পড়ছেন। কিন্তু অর্থের অঙ্কে, অর্থাৎ আয় বা ব্যয়ক্ষমতার নিরিখে দারিদ্র্যকে মাপার প্রয়োজন থেকেই যায়। কত জন স্কুলে যেতে পারছে, ক’টা বাড়িতে শৌচাগার রয়েছে, এমন সব প্রশ্নের উত্তর থেকে বোঝা যাবে না যে নিজের দৈনন্দিন চাহিদাগুলি মেটানোর মতো খরচের সামর্থ্য রয়েছে কত জনের। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তিন মাস আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবি করেছিলেন, তাঁর দশ বছরের শাসনকালে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের কবল থেকে বেরিয়েছেন। দাঁড়িপাল্লা, বাটখারা আর দোকানি, প্রতিটির প্রতি সন্দেহ প্রবল হলে ক্রেতার যে দশা হয়, ভারতে দারিদ্র্যের সরকারি পরিমাপ জেনে তেমনই বিমূঢ়, বিরক্ত হয়েছিলেন দেশবাসী।
প্রশ্ন উঠেছিল, দারিদ্র্য মাপার আন্তর্জাতিক সূচকগুলির সঙ্গে কেন ইচ্ছেমতো নতুন সূচক যোগ করছে কেন্দ্র? দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ করতে রোজগারের যে সীমা অতীতে নির্ধারিত হয়েছিল, মূল্যস্ফীতির নিরিখে তাতে কতটা কী বদল আনা হল, কিসের ভিত্তিতে বদল করা হল, তা স্পষ্ট না করেই এমন পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হল কেন? ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে ২০২০-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য কমার হিসাব, এবং দারিদ্র্যের পরিমাপে জাতীয় নমুনা সমীক্ষার পরিসংখ্যান ব্যবহার, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বোপরি, দারিদ্র্য মাপার বিষয়টিকে কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকটি মন্ত্রক আর নীতি আয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে একটা রহস্যময় মন্ত্রণার আকার দেওয়া হয়েছে। মাঝেমাঝে কিছু তাক-লাগানো পরিসংখ্যান স্ফুলিঙ্গের মতো গণমাধ্যমে উঠে এসে, চারদিক থেকে নানা প্রশ্নের সামনে পড়ে, নিরুত্তরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নীতি নিয়ে সরকার ও নাগরিকের কোনও সংলাপ গড়ে উঠছে না। দারিদ্র্য নিরসনে ব্যর্থতা ঢাকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চলছে পরিসংখ্যান নির্মাণের সরকারি কর্মশালা।