পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত বারবারই বিশ্ব অর্থনীতির উপর ছায়া ফেলে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই পুরনো আশঙ্কাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। গত জুন মাসে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (মউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, আপাতত পরিস্থিতি শান্ত হবে। তেলের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হবে, বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা কমবে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন টেকেনি। এখন আবার সংঘর্ষের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসছে এবং তার প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে।
সমস্যার মূল কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী— বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়। এই প্রণালীকে ঘিরে ইরান ও আমেরিকার অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান মনে করে, এই পথের ওপর তার কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। অন্যদিকে আমেরিকা ও তার মিত্ররা চায়, এই পথ যেন আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত থাকে এবং কোনও একক দেশের নিয়ন্ত্রণে না থাকে। এই মতপার্থক্যই এখন নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে।
বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে, তা হলো— ইরান আবার তার সামরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এই পথের জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি উদ্বেগজনক বিষয়— ইরানের মিত্র বা তথাকথিত ‘প্রক্সি’ গোষ্ঠীগুলিও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। অর্থাৎ, শুধু একটি পথ নয়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট এখন ঝুঁকির মুখে।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যেই ব্যারেল প্রতি ৯৫ ডলার ছুঁয়ে ফেলেছে। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর প্রভাব পড়বে প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে আমদানি-নির্ভর দেশগুলিতে। ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে এর অভিঘাত আরও বেশি। কারণ আমরা তেলের বড় অংশই আমদানি করি। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে মূল্যবৃদ্ধির চাপ এসে পড়ে।
টাকার মানও এই পরিস্থিতির প্রভাবে দুর্বল হচ্ছে। ডলার-রুপি বিনিময় হার আবার ৯৬-এর উপরে উঠে গিয়েছে, যা আমদানি আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে। অর্থাৎ, একদিকে তেলের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন— এই দ্বৈত চাপ অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করছে।
প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে? এর উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে আমেরিকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশলের ওপর। যদি আমেরিকা শুধু সীমিত আকাশপথে হামলা চালিয়ে যায়, তবে ইরান তার অবস্থান বজায় রেখেই প্রণালীতে চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। কিন্তু যদি বড়সড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে— যার খরচ হবে বহুগুণ বেশি, শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক দিক থেকেও।
অন্য একটি সম্ভাবনা হলো, কোনও সমঝোতার মাধ্যমে ইরানকে আংশিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু সেটি হবে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নীতির বড় পরিবর্তন, যা অন্য অনেক অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এবারের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে আরেকটি বিষয়। আগের দফার সংঘাতে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন দেশ তাদের জরুরি মজুত থেকে তেল ছেড়েছিল। কিন্তু সেই মজুত এখন অনেকটাই ফুরিয়ে এসেছে। ফলে এবার যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হতে পারে। উপরন্তু, রাশিয়ার তেল পরিকাঠামোর উপর ইউক্রেনের হামলাও বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সমাধানের পথ কোথায়? দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে এমন কোনও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নেই, যে উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারে। কূটনৈতিক উদ্যোগ দুর্বল এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রবল।
পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত আর কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি এখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে। অস্থায়ী সমঝোতা দিয়ে এই সংকট মেটানো যাবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সুস্পষ্ট এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান। তা না হলে, এর মূল্য শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়— ভারতসহ গোটা বিশ্বকেই দিতে হবে।
পশ্চিম এশিয়ায় আবার অস্থিরতা
Photo: Statesman