শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি, জড়িয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্বাধীনতার প্রশ্ন

File Photo

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তার দীর্ঘ ঐতিহ্য, মুক্তচিন্তার পরিবেশ এবং গবেষণার মান শুধু বাংলায় নয়, দেশ-বিদেশেও পরিচিত। তাই এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর বা রাজনৈতিক দখলদারির ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের। সম্প্রতি ছাত্র সংগঠনগুলির বিরোধকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা ও হিংসার ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু কয়েকটি সংগঠনের দ্বন্দ্ব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষাঙ্গনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্বাধীনতার প্রশ্ন।

ছাত্রদের নিজেদের সংগঠন তৈরি করা, মত প্রকাশ করা বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের নানা সমস্যা থাকে— পরিকাঠামোর অভাব, পরীক্ষার ব্যবস্থা, হস্টেলের সমস্যা, ফি, নিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ ইত্যাদি। এসব বিষয়ে ছাত্রদের সংগঠিত হয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো স্বাভাবিক। তাই প্রতিবাদকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা কোনও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

কিন্তু প্রতিবাদের অধিকার কখনও হিংসার অধিকার নয়। কোনও ছাত্র সংগঠন অন্য সংগঠনের সদস্যদের শত্রু বা ‘দেশদ্রোহী’ বলে চিহ্নিত করে তাদের ওপর আক্রমণ করলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়। রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা করা যায় যুক্তি দিয়ে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে ভয় দেখিয়ে বা শক্তি প্রয়োগ করে চুপ করিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পরিপন্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক বা ঐতিহ্যকে অসম্মান করাও একই ভাবে নিন্দনীয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব।


এই সমস্যার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ছাত্র রাজনীতিতে বাইরের রাজনৈতিক দলের অতিরিক্ত প্রভাব। ভারতের বহু রাজনৈতিক নেতা ছাত্রজীবনে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্র রাজনীতি তাঁদের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা দিয়েছে। ফলে ছাত্র রাজনীতি নিজে খারাপ কিছু নয়। সমস্যা শুরু হয় যখন রাজনৈতিক দলগুলি ছাত্রদের নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে থাকে। তখন শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যা পিছনে পড়ে যায় এবং ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্র।

তবে এর সমাধান হিসেবে ছাত্র রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। এমন নিষেধাজ্ঞা ছাত্রদের ন্যায্য দাবি জানানোর পথও বন্ধ করে দিতে পারে। বরং প্রয়োজন স্পষ্ট নিয়ম, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং সবার জন্য সমান আচরণ। কোনও সংগঠন রাজনৈতিকভাবে বাম, ডান বা অন্য যে মতেরই হোক, হিংসা বা ভাঙচুর করলে একই নিয়মে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসনের দেরি বা পক্ষপাতের ধারণা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তাই অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মত তদন্ত জরুরি।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলিরও দায়িত্ব রয়েছে। ছাত্রদের গণতান্ত্রিক মত প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে, কিন্তু তাদের দিয়ে সংঘাত তৈরি করা চলবে না। জাতীয় রাজনীতির ভাষা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে, তখন অনেক সময় মতবিরোধ ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়। এই প্রবণতা বন্ধ করা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞান, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার জায়গা। সেখানে কোনও মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার উত্তর হওয়া উচিত আরও ভালো যুক্তি, আলোচনা ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ। ছাত্রদের আন্দোলন থাকবে, সংগঠন থাকবে, মতের সংঘাতও থাকবে— কিন্তু হিংসা থাকবে না। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলিকে ক্যাম্পাসের স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করতে হবে।

শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা হয়তো বাস্তবে সম্পূর্ণ সম্ভব নয়, কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে যাতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না হয়, সেই সীমারেখা তৈরি করা সম্ভব। ছাত্র, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল— সব পক্ষকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় কোনও একটি ছাত্র সংগঠনের জয় নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় মানে মুক্তচিন্তা, নিরাপদ পরিবেশ এবং শিক্ষার মর্যাদার জয়।