একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে গণতন্ত্রের রূপরেখা কেবল ভোটবাক্স কিংবা ব্যালট পেপারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা স্থানান্তরিত হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল জগতে। তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)- এর অভাবনীয় প্রসারের ফলে তথ্যের আদান-প্রদান যেমন দ্রুততর হয়েছে; তেমনই তার সমান্তরালে শুরু হয়েছে এক নিঃশব্দ বিপর্যয়— ‘ডিজিটাল এরোশন’ (Digital Erosion) বা ডিজিটাল ক্ষয়প্রক্রিয়া। সত্য ও মিথ্যার সীমানা আবছা হয়ে যাওয়ার এই যুগে সত্যতা; বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণমাধ্যমের স্বকীয়তা ক্রমান্বয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে এই ডিজিটাল ক্ষয়প্রক্রিয়া আজ কেবল সামাজিক যোগাযোগের সমস্যা নয়; বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক অভূতপূর্ব এবং গভীর রাজনৈতিক সংকট।
তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ বার্তালাপ যে কোনও সচল গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি বা প্রাণশক্তি। নাগরিকরা যখন সঠিক এবং নিরপেক্ষ তথ্য হাতে পান, তখনই তাঁরা প্রজ্ঞাপূর্ণ ভোটাধিকার প্রয়োগ ও সরকারের নীতির গঠনমূলক সমালোচনা করতে সক্ষম হন। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ‘ডিপফেক’, ভয়েস ক্লোনিং এবং সুসংগঠিত ‘আইটি সেল’-এর রটানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের দাপটে সেই গণতান্ত্রিক আলোচনার পথ রুদ্ধ হচ্ছে। আজ কোনও রাজনৈতিক নেতার ভুয়ো অডিও বার্তা কিংবা কৃত্রিমভাবে তৈরি হিংসাত্মক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে জনমতকে প্রভাবিত করা বা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটানো সম্ভব হচ্ছে। সত্যকে আড়াল করে আবেগ এবং ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়ার এই যে চক্রান্ত, তা নাগরিকের স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ধাপে ধাপে ক্ষয় বা ‘এরোড’
করে দিচ্ছে।
এই সংকটের মূল অনুঘটক হলো অ্যালগরিদম-নির্ভর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলির ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হল ইউজার এনগেজমেন্ট বা ব্যবহারকারীদের ধরে রাখা। পরিসংখ্যান এবং গবেষণা বলছে— গঠনমূলক বা সত্য খবরের চেয়ে চাঞ্চল্যকর, বিতর্কিত ও উস্কানিমূলক বার্তা ইন্টারনেটে অনেক বেশি দ্রুত ছড়ায়। এর ফলে তৈরি হয় ‘ইকো চেম্বার’ ও ‘ফিল্টার বাবল’ (Filter Bubble), যেখানে ব্যবহারকারী কেবল তার নিজস্ব রাজনৈতিক বা সামাজিক মতাদর্শের অনুকূল তথ্যই দেখতে পান। বিপরীত মত বা যুক্তিবাদী আলোচনার কোনও জায়গা সেখানে থাকে না। ফলে সমাজে বহুত্ববাদ ও সহনশীলতার জায়গা নিচ্ছে চরমপন্থী চিন্তাধারা ও ডিজিটাল মেরুকরণ, যা গণতান্ত্রিক ঐক্যের পরিপন্থী।
দ্বিতীয়ত, অবাধ তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে প্রথাগত গণমাধ্যম বা ফোর্থ এস্টেট-এর ঐতিহ্যবাহী ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। খবরের সত্যতা যাচাই বা ‘ফ্যাক্ট চেকিং’- এর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে ‘লাইক’ ‘শেয়ার’ ও ‘ভিউ’ পাওয়ার প্রতিযোগিতা প্রাধান্য পাচ্ছে। অনেক সময় মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলিও না জেনে বা টিআরপি-র তাড়নায় সামাজিক মাধ্যমের অননুমোদিত ভুয়ো খবরকে প্রচার করে ফেলে। এর ফলে গণমাধ্যমের ওপর সাধারণ মানুষের মৌলিক আস্থা বিনষ্ট হচ্ছে। আর যখন কোনও দেশের সংবাদমাধ্যমের ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাস উঠে যায়, তখন স্বৈরাচারী বা পপুলিস্ট শক্তিগুলোর পক্ষে জনমতকে বিভ্রান্ত করা অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়ে।
নির্বাচনী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই ডিজিটাল এরোশন আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করে। সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচন ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নির্বাচনের কৌশল হিসেবে ‘টার্গেটেড পলিটিক্যাল অ্যাডভার্টাইজিং’ এবং ডেটা মাইনিং-কে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভোটারদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণ করে তাদের মনে ভয় বা পক্ষপাত তৈরি করার মতো কন্টেন্ট পরিবেশন করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বা আইনি পরিকাঠামো এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল অপরাধ ও অ্যালগরিদমিক কারচুপির গতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। খাতা-কলমে নির্বাচন মুক্ত ও অবাধ মনে হলেও, অলক্ষ্যে ভোটারের মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতাকে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বা ‘ম্যানিপুলেট’ করা হচ্ছে।
তাহলে এই ডিজিটাল ক্ষয়প্রক্রিয়ার হাত থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার উপায় কী? প্রথমত, প্রযুক্তিগত ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিকে কেবল তথ্যবাহক হিসাবে না দেখে, তাদের মাধ্যমে প্রচারিত কনটেন্টের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সময়ে এআই–জেনারেটেড কনটেন্ট বা ডিপফেক চিহ্নিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ওয়াটার মার্কিং’ ও অ্যালগরিদম ফিল্টারিং বাধ্যতামূলক করা জরুরী।
দ্বিতীয়ত, আইনি কাঠামোর সংস্কার। তথ্য প্রযুক্তি আইন বা আইটি অ্যাক্টকে সময়োপযোগী করে ব্যক্তি গোপনীয়তা ও বাকস্বাধীনতা রক্ষা করার পাশাপাশি ভুয়ো তথ্য প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ডিজিটাল সুরক্ষার নামে সরকার যেন নাগরিকদের মৌলিক বাকস্বাধীনতা বা গঠনমূলক ডিজিটাল প্রতিবাদকে দমন করার সুযোগ না পায়।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথটি হল ‘ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি’ বা ডিজিটাল গণমাধ্যম সচেতনতা বৃদ্ধি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজ— সর্বত্র তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট- চেকিংয়ের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ইন্টারনেটে যা দেখা যাচ্ছে বা শোনা যাচ্ছে তা-ই সত্য নয়—- এই সুস্থ সংশয়বাদ নাগরিক মনে তৈরি না হলে কেবল আইন করে ডিজিটাল এরোশন থামানো সম্ভব নয়।
তবে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই ভালো বা খারাপ নয়; তার ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে সেটাই নির্ণায়ক। ডিজিটাল মাধ্যম আমাদের যোগাযোগের পরিধি অভূতপূর্বভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সতর্ক না হলে এই ডিজিটাল সাম্রাজ্যই আমাদের রক্তে অর্জিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধীরে ধীরে গ্রাস করবে। প্রযুক্তির গতি এবং গণতান্ত্রিক সচেতনতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে, ‘জনগণের দ্বারা; জনগণের জন্য’ পরিচালিত সরকার কেবল ডিজিটাল ডেটা ও অ্যালগরিদমের হাতের পুতুলে পরিণত হবে। গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত রাখতে হলে ডিজিটাল এরোশনের এই নীরব আঘাতকে প্রতিরোধ করাই এখন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় জাতীয় লড়াই।