চিন, আরএসএস ও দ্বিধার কূটনীতি

ভারত-চিন সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যে গভীর অবিশ্বাস ও উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তার প্রেক্ষিতে আরএসএস সদর দপ্তরে চিনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি নিছক ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বিশেষত যখন সেই বৈঠক ঘিরে সরকার ও সংঘ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রশ্নগুলিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে বিজেপি নেতৃত্ব যে কড়া জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিয়েছিল, ‘লাল চোখ’ দেখানোর যে ভাষ্য গড়ে তোলা হয়েছিল, মঙ্গলবারের এই ঘটনাপ্রবাহ তার সঙ্গে মেলে না বলেই মনে হচ্ছে। একদিকে চিন এখনো অরুণাচল প্রদেশের নাম পরিবর্তন করে, শাক্সগাম উপত্যকা নিয়ে দাবি তোলে, পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ায় ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মতো সামরিক অভিযানের সময়, অন্যদিকে সেই চিনের শাসকদলের প্রতিনিধিরা সরাসরি আরএসএস ও বিজেপি সদর দফতরে বৈঠক করছেন। এই দ্বৈততা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, আরএসএসের মতো একটি অ-রাষ্ট্রীয় (নন-গভর্নমেন্টাল), কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী সংগঠনের সঙ্গে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠক। সংঘ পরিবারের দাবি, এটি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ, অনুরোধ এসেছিল চিনের দিক থেকেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘সৌজন্য’ শব্দটি প্রায়ই বাস্তব রাজনীতির পর্দা। আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের অনুপস্থিতি হয়তো সচেতন দূরত্বের বার্তা, কিন্তু তাতে প্রশ্নের ভার কমে না— বিদেশি শাসক দলের প্রতিনিধির সঙ্গে সংঘের বৈঠক আদৌ কী বার্তা দিচ্ছে?


উল্লেখযোগ্য যে, গত বছর আরএসএসের শতবর্ষ উপলক্ষে মোহন ভাগবতের বক্তৃতামালায় চিন, পাকিস্তান ও তুরস্কের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তখন জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত উত্তেজনার যুক্তি সামনে আনা হয়েছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই অবস্থানের এত বড় পরিবর্তন কি শুধুই ‘সম্পর্কের উষ্ণতা’-র ফল? না কি এটি বৃহত্তর কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত?

বিজেপি নেতৃত্ব বলছে, ছয় বছর পর এই বৈঠক হয়েছে কারণ ভারত-চিন সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলেছে। কিন্তু সেই ‘উন্নতি’র বাস্তব রূপরেখা কী? সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার সম্পূর্ণ হয়নি, চিনের পরিকাঠামো নির্মাণ অব্যাহত, কূটনৈতিক স্তরে সন্দেহ কাটেনি। এমন অবস্থায় দলীয় স্তরে বৈঠক কতটা বাস্তব ফলপ্রসূ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
কংগ্রেসের আক্রমণ প্রত্যাশিত। ‘লাল চোখ’ থেকে ‘লাল সেলাম’-এর রূপক রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ।

তবে কংগ্রেসের অভিযোগের কেন্দ্রে যে বিষয়টি রয়েছে— স্বচ্ছতার অভাব— তা অগ্রাহ্য করা যায় না। বন্ধ দরজার আড়ালে কী আলোচনা হল, শাক্সগাম উপত্যকা, পাকিস্তান-সমর্থন, বাণিজ্যিক বৈষম্য— এই প্রশ্নগুলি আদৌ উঠেছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো সরকারি বিবৃতি নেই।বিজেপির পাল্টা যুক্তি— তারা গোপনে কোনো মউ স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু প্রশ্ন কেবল চুক্তি নিয়ে নয়, প্রশ্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।

একদিকে দেশবাসীকে চিনা পণ্য বয়কটের ডাক, অন্যদিকে জম্মু ও কাশ্মীরে চিনা সংস্থাকে মিটার তৈরির বরাত— এই দ্বৈত বার্তা জনমানসে বিভ্রান্তি তৈরি করে।আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাস্তববাদ অবশ্যই জরুরি। চিন ভারতের প্রতিবেশী, বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি, তাকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তববাদ আর আপসের সীমারেখা স্পষ্ট থাকা দরকার। আরএসএস ও বিজেপির ক্ষেত্রে সেই সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, পররাষ্ট্র নীতিতে দল ও  বিশেষ আদর্শের একটি সংগঠনের ভূমিকা ক্রমশ মিশে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রই বিদেশনীতি নির্ধারণ করবে, এটাই স্বাভাবিক। সেখানে ‘অ-রাষ্ট্রীয় খেলোয়াড়’-দের সক্রিয় ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে। চিনের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন, কিন্তু প্রশ্ন হল— কী অবস্থান থেকে, কতটা স্বচ্ছতায়, এবং কার মাধ্যমে। লাল চোখ দেখানোর রাজনীতি যদি শেষ পর্যন্ত লাল গালিচায় পরিণত হয়, তবে তার ব্যাখ্যা দেশবাসীর কাছে স্পষ্টভাবে দেওয়াই শাসকের দায়িত্ব। তা  নাহলে এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে দাঁড়াবে।