শিক্ষকের হাতে শিশুর নিরাপত্তা

Image: AI নির্মিত

বিশাখাপত্তনমের একটি স্কুলে ছয় বছরের শিশু প্রণয় তেজের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার সামনে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। হোম ওয়ার্ক শেষ না করার অপরাধে একজন শিক্ষকের হাতে শিশুটিকে যে অপমান, ভয় এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, তা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শ্রেণিকক্ষের সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটির অসহায় অবস্থার যে ছবি সামনে এসেছে, তা যে কোনও সংবেদনশীল মানুষকে শিউরে ওঠার মতো।

একটি শিশু স্কুলে যায় শেখার জন্য, ভয় পাওয়ার জন্য নয়। শিক্ষক তার কাছে অভিভাবকের মতো। সেই মানুষটির কাছ থেকেই যদি অপমান ও নির্যাতন আসে, তাহলে শিশুর নিরাপত্তাবোধ কোথায় থাকবে? প্রণয়ের মৃত্যু তাই শুধু একজন শিক্ষকের অপরাধের ফল নয়; এটি স্কুলের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা, শিক্ষকতার মান এবং নজরদারির ক্ষেত্রেও বড় ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

ভারতে শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার বিরুদ্ধে আইন ও আদালতের নির্দেশ বহুদিন ধরেই রয়েছে। ২০০০ সালে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছিল, শিক্ষার্থীদের এমন পরিবেশে শিক্ষা দিতে হবে যেখানে তারা ভয়মুক্ত এবং মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে। পরে ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইনেও স্কুলে শারীরিক শাস্তি এবং মানসিক নির্যাতন নিষিদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ নিয়মের অভাব নেই। অভাব হচ্ছে সেই নিয়ম যথাযথভাবে কার্যকর করার।

প্রশ্ন হল, এত বছর পরেও কেন স্কুলে শিশুকে মারধর, কান ধরে ওঠবস করানো, সকলের সামনে অপমান করা কিংবা ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটে? আসলে অনেক ক্ষেত্রেই শাস্তিকে এখনও শিক্ষার একটি স্বাভাবিক পদ্ধতি বলে মনে করা হয়। কিছু শিক্ষক মনে করেন, কঠোরতা ছাড়া শৃঙ্খলা সম্ভব নয়। এই ধারণা বদলানো জরুরি। শৃঙ্খলা এবং নির্যাতন এক জিনিস নয়।


একজন ভালো শিক্ষক কঠোর হতে পারেন, কিন্তু নিষ্ঠুর হতে পারেন না। প্রণয় তেজের ঘটনায় আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে— স্কুলে সিসিটিভি থাকা। এর ফলে অন্তত ঘটনার কিছু প্রমাণ সামনে এসেছে। কিন্তু দেশের অসংখ্য স্কুলে এমন নজরদারি নেই। ফলে শ্রেণিকক্ষের ভিতরে কী ঘটছে, তার অনেকটাই অভিভাবকদের অজানা থেকে যায়। অবশ্য সিসিটিভি কোনও সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। ক্যামেরা শিক্ষককে ভালো শিক্ষক বানাতে পারে না। কিন্তু অভিযোগের ক্ষেত্রে সত্য উদ্ঘাটন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে। একজন শিক্ষককে শুধু একটি বিষয় পড়ানোর দক্ষতা থাকলেই চলবে না। শিশুমন, আচরণ, মানসিক বিকাশ এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে কীভাবে শিশুর সঙ্গে কথা বলতে হয়— এসব বিষয়েও প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। শিশুকে ভুল করলে বোঝাতে হবে, তাকে হেয় করা নয়। তার দুর্বলতাকে সংশোধন করতে হবে, কিন্তু তার আত্মসম্মান নষ্ট করে নয়।

শিশুর মনে অপমানের ক্ষত অনেক গভীর হতে পারে। একটি বয়সে যে কথাকে বড়রা তুচ্ছ বলে মনে করেন, সেটিই কোনও শিশুর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই শিক্ষককে প্রতিটি শিশুর প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। বিদ্যালয়কে হতে হবে এমন একটি জায়গা, যেখানে শিশু ভুল করার পরও নিরাপদ বোধ করবে।

প্রণয় তেজের ক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। তদন্ত দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে শেষ হওয়া দরকার। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিও হওয়া উচিত। একই সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষের দায়ও খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় শুধু একজন শিক্ষকের নয়, গোটা প্রতিষ্ঠানের।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্কুলগুলিকে নতুন করে নিজেদের ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, শিশু সুরক্ষা নীতি এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি—সবকিছুকেই আরও শক্তিশালী করতে হবে।

শিক্ষকতা নিছক চাকরি নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক দায়িত্ব। একজন শিক্ষক একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন, আবার তাঁর ভুল আচরণ সেই ভবিষ্যৎকে ধ্বংসও করতে পারে। তাই আমাদের স্কুলে শুধু শিক্ষক চাই না, চাই প্রকৃত শিক্ষাবিদ— যাঁরা পড়াবেন, বুঝবেন, পথ দেখাবেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, শিশুদের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে সবার আগে রাখবেন।প্রণয়ের মতো আর কোনও শিশুর জীবন যেন শিক্ষার নামে নিষ্ঠুরতার বলি না হয়— এটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।