পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত— সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) ও সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)-এর হাতে প্রায় ৫৪.২ একর জমি স্থায়ী হস্তান্তর— শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক পরিকাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা— আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর ও মালদায় এই জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে মূলত সীমান্ত চৌকি, বেড়া নির্মাণ ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার জন্য।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শিলিগুড়ি করিডর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রস্থের এই ভূখণ্ড ভারতের মূলভূমির সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থল সংযোগ। এই সরু করিডরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে নেপাল, অন্যদিকে ভুটান ও বাংলাদেশ, আর কাছেই চীনের উপস্থিতি— সব মিলিয়ে এটি ভারতের নিরাপত্তার একটি সংবেদনশীল কেন্দ্রবিন্দু। এখানে সামান্য বিঘ্নও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। ফলে সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা সময়ের দাবি।
রাজ্যের তরফে জানানো হয়েছে, এই জমি হস্তান্তর সাধারণ মানুষের বসতি বা জীবিকায় প্রভাব ফেলবে না এবং কেবল নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজেই ব্যবহৃত হবে। এই আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতীতে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা গিয়েছে। প্রশাসনের উচিত হবে এই প্রতিশ্রুতি কঠোরভাবে রক্ষা করা এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ বজায় রাখা।
একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত একটি পুরনো সমস্যার দিকেও আঙুল তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি বড় অংশ— প্রায় ৬০০ কিলোমিটার— সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে অনেক এলাকাই নদীবাহিত, যেখানে বেড়া নির্মাণ প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন। তবু সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পাচার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি রোধ করতে হলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, ভাসমান নজরদারি ব্যবস্থা বা স্মার্ট ফেন্সিংয়ের মতো বিকল্প পদ্ধতির কথাও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার।
এই প্রেক্ষিতে বিএসএফ ও এসএসবি-র পরিকাঠামো সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। সীমান্তে কর্মরত বাহিনীগুলির জন্য পর্যাপ্ত ক্যাম্প, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, রাস্তাঘাট ও লজিস্টিক সুবিধা না থাকলে তাদের কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই বাহিনীগুলিকে আরও আধুনিক ও সক্ষম করে তোলা প্রয়োজন।
তবে এই পদক্ষেপকে শুধুমাত্র নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্রটি সম্পূর্ণ হয় না। সীমান্ত অঞ্চলের উন্নয়ন, স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশের ভারসাম্য— এই সব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পরিকাঠামো গড়ে তোলার সময় পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের নীতি অনুসরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এই প্রকল্পগুলি আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় এই ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় শর্ত। অতীতে জমি হস্তান্তর নিয়ে যে টানাপোড়েন ছিল, তা কাটিয়ে উঠে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ইতিবাচক দিক। তবে ভবিষ্যতেও যেন এই সমন্বয় বজায় থাকে এবং রাজনৈতিক মতভেদ প্রশাসনিক কাজে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেটিই কাম্য।
শিলিগুড়ি করিডরের মতো একটি স্পর্শকাতর অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বাগত। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, স্থানীয় মানুষের স্বার্থ কতটা রক্ষা করা হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ কতটা টেকসই হয় তার উপর। উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে পারলেই এই সিদ্ধান্ত প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়ে উঠবে।
‘চিকেনস নেক’ ও সীমান্ত নিরাপত্তা চিন্তা ভারতের
প্রতীকী ছবি