বিমানভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীস্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে কেন্দ্রের নতুন বিমান পরিবহন বিধি

Photo-SNS

বিমানযাত্রা এখন আর শুধু বিলাসিতার বিষয় নয়। ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, চাকরি কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে বিমান পরিষেবার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু বিমানভাড়া নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে উৎসবের মরসুমে, ছুটির দিনে কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে টিকিটের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের পক্ষে তখন বিমানযাত্রা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। সম্প্রতি পুজোর মরসুমে দিল্লি থেকে কলকাতার বিমানভাড়া উঠেছিল ৭০ হাজার টাকা। এই পরিস্থিতিতে বিমানভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীস্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে কেন্দ্রের নতুন বিমান পরিবহন বিধি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রক ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর নতুন নিয়ম বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। ৩১ অক্টোবর তা সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। ‘ভারতীয় বায়ুযান নিয়ম, ২০২৪’-এর অন্তর্ভুক্ত এই বিধিগুলি ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এর ফলে ১৯৩৭ সালের পুরনো বিমান নিয়মের অবসান ঘটবে। নতুন ব্যবস্থায় বিমানভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের ক্ষমতা আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।

আগে ১৯৩৭ সালের বিমান নিয়মের ১৩৫(৪) ধারায় অসামরিক বিমান পরিবহণের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ কোনও বিমান সংস্থার ভাড়া অতিরিক্ত বলে মনে করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দেশ দিতে পারত। কিন্তু নতুন নিয়মের ১৯২(৬) ধারায় এই ক্ষমতা সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে দেওয়া হয়েছে। কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জনস্বার্থ রক্ষার জন্য সরকার প্রয়োজন মনে করলে বিমান সংস্থাগুলিকে লিখিত নির্দেশ দিতে পারবে। তবে এই হস্তক্ষেপ হতে হবে পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।


এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বোঝা দরকার। নতুন নিয়মের অর্থ এই নয় যে, সরকার প্রতিদিন বিমানের টিকিটের দাম নির্ধারণ করবে, অথবা প্রতিটি ভাড়ার জন্য সরকারের অনুমতি নিতে হবে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিমান সংস্থাগুলি নিজেরাই ভাড়া ঠিক করবে। কিন্তু কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে। অর্থাৎ বাজারের স্বাধীনতা বজায় রেখেও জনস্বার্থ রক্ষার একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।

নতুন নিয়মের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল টিকিটের দাম সম্পর্কে স্বচ্ছতা। এত দিন যাত্রীরা অনেক সময় বুকিংয়ের সময় একটি ভাড়া দেখতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকিট কাটতে গিয়ে নানা ধরনের অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হতেন। কর, পরিষেবা ফি এবং অন্যান্য চার্জ যোগ হওয়ার ফলে মোট খরচ বেড়ে যেত। নতুন নিয়মে বিমান সংস্থাগুলিকে বুকিংয়ের ওয়েবসাইটে এবং টিকিটে মোট কত টাকা দিতে হবে, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। পাশাপাশি মূল ভাড়া, কর, ফি, বাতিল করার চার্জ, টাকা ফেরতের শর্ত এবং অন্যান্য খরচ আলাদা করে দেখাতে হবে।

এই নির্দেশ শুধু ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলির জন্য নয়। ভারতের ভিতরে নির্ধারিত বিমান পরিষেবা চালানো ভারতীয় সংস্থার পাশাপাশি ভারত থেকে, ভারতে এবং ভারতের আকাশসীমা পেরিয়ে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক পরিষেবা চালানো বিদেশি বিমান সংস্থাগুলিকেও এই নিয়ম মানতে হবে।

নতুন বিধিতে বিমানভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয়ের মতো বিষয় বিবেচনা করার কথাও বলা হয়েছে। ভারতীয় নির্ধারিত বিমান সংস্থাগুলিকে তাদের ভাড়ার তালিকা ডিজিসিএ-র কাছে জমা দিতে হবে। ডিজিসিএ সেই ভাড়ার উপর নজরদারি করবে। ফলে বিমান সংস্থাগুলির ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছুটা জবাবদিহি বাড়বে বলে আশা করা যায়।

তবে শুধু নিয়ম তৈরি করলেই যাত্রীদের সমস্যা মিটবে না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এই নিয়ম বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে। উৎসবের সময় বা জরুরি পরিস্থিতিতে বিমানভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে সরকার কত দ্রুত ব্যবস্থা নেবে? বিমান সংস্থাগুলি নিয়ম মেনে ভাড়ার সব তথ্য প্রকাশ করছে কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? যাত্রীরা অভিযোগ জানালে তার দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

বিমান পরিবহন একটি ব্যবসা হলেও তা জনস্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই বিমান সংস্থার মুনাফার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই যাত্রীদের ন্যায্য ভাড়ায় পরিষেবা পাওয়ার অধিকারও রয়েছে। বিশেষ করে দেশের মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করা জরুরি।