জনগণনা: রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

কেন্দ্র সরকার অবশেষে দীর্ঘ বিরতির পর জনগণনা শুরু করতে চলেছে, এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে স্বাগত। তবে এটিকে কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জনগণনা আসলে রাষ্ট্রের নিজের নাগরিকদের সম্পর্কে জানার সবচেয়ে বড় ও মৌলিক উপায়, এক অর্থে এটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন।

২০১১ সালের পর থেকে ভারতের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল দেশে জনসংখ্যার প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বেড়েছে, শহরের সীমানা প্রসারিত হয়েছে, গ্রাম-শহরের পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে ঝাপসা হয়ে গেছে এবং শ্রমবাজার আরও বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে। কিন্তু নীতিনির্ধারণে ব্যবহৃত তথ্য অনেকাংশেই পুরনো বা অনুমাননির্ভর। এর ফলে বাস্তবতার সঙ্গে নীতির একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যার মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন জনগণনা কেবল একটি তথ্যসংগ্রহের কাজ নয়, এটি নীতিনির্ধারণকে বাস্তবতার মাটিতে ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্ভুল জনমিতিক তথ্য অপরিহার্য। বিশেষ করে যখন ভারত তথাকথিত ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ (ডেমোগ্র্যাফিক ডিভিডেন্ড)-এর এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, তখন এই তথ্যের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সঠিক পরিকল্পনা না হলে এই সম্ভাবনাই ভবিষ্যতে বোঝা হয়ে উঠতে পারে। তরুণ জনগোষ্ঠীর সঠিক মানচিত্র না থাকলে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের নীতি ভ্রান্ত পথে যেতে পারে, আবার শহরমুখী জনসংখ্যার প্রকৃত চাপে নজর না দিলে নগর পরিকাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।


তবে জনগণনার সাফল্য কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতার উপর নির্ভর করে না, এর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের আস্থা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নাগরিকত্ব, পরিচয়পত্র এবং বিভিন্ন ডেটাবেসকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব জনগণনার উপর পড়া অস্বাভাবিক নয়। অনেকের মধ্যেই এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, তাদের দেওয়া তথ্য ভবিষ্যতে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে। ফলে জনগণনা যদি সত্যিই নির্ভুল হতে চায়, তবে প্রথম শর্ত হল— মানুষকে এই প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে দেওয়া।

এই আস্থা গড়ে তোলার জন্য স্বচ্ছতা অপরিহার্য। জনগণনার উদ্দেশ্য, ব্যবহার এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছনো দরকার। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনও নাগরিক তাঁর তথ্য দেওয়ার কারণে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। জনগণনা তখনই সফল হবে, যখন মানুষ এটিকে নিজের অংশগ্রহণমূলক অধিকার হিসেবে দেখবেন, কোনও নজরদারির যন্ত্র হিসেবে নয়। এখানে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বও কম নয়— জনগণের মনে আস্থা সৃষ্টির জন্য একটি স্পষ্ট ও সংবেদনশীল বার্তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

জাতিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের প্রশ্ন এই জনগণনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে, এই তথ্য সামাজিক বৈষম্য বোঝার জন্য অপরিহার্য; অন্যদিকে, এটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। তাই এই সংবেদনশীল বিষয়টিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে, যাতে তথ্যের ব্যবহার হয় ন্যায়সঙ্গত উন্নয়নের জন্য, বিভাজন সৃষ্টির জন্য নয়। একই সঙ্গে দরকার এই তথ্যের ব্যাখ্যায় পরিসংখ্যানগত সততা ও নীতিগত স্বচ্ছতা, যাতে তা কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত না হয়।

সবশেষে বলা যায়, জনগণনা কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে এক নীরব চুক্তি। রাষ্ট্র জানতে চায়, নাগরিক কে, আর নাগরিক জানতে চান, সেই তথ্য দিয়ে রাষ্ট্র কী করবে। এই পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি যদি আস্থা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের উপর দাঁড়ায়, তবে জনগণনা একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক উপকরণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, এটি আরেকটি পরিসংখ্যানগত অনুশীলন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ধারণ করবে শুধু নীতিনির্ধারণের ভবিষ্যৎ নয়, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিও কতটা দৃঢ় থাকবে।