জনগণনা কোনও দেশের জন্য শুধু মানুষের সংখ্যা জানার একটি প্রক্রিয়া নয়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, প্রশাসনিক পরিকাঠামো তৈরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার বিস্তার এবং জনসংখ্যার পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে জনগণনার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় কতগুলি স্কুল, হাসপাতাল, শহর বা যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে, সেই পরিকল্পনার পিছনে জনগণনার তথ্য বড় ভূমিকা নেয়। একই সঙ্গে মানুষের শিক্ষার স্তর, বয়সের বিন্যাস, পরিবারের ধরন এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয় সম্পর্কেও একটি সামগ্রিক ছবি পাওয়া যায়।
এই কারণেই ভারতের আসন্ন জনগণনায় প্রশ্নের সংখ্যা বাড়াকে স্বাভাবিকভাবেই দেখা যেতে পারে। ব্রিটিশ আমলে ভারতের প্রথম জনগণনায় যেখানে ১৭টি প্রশ্ন ছিল, সেখানে এবার প্রশ্নের সংখ্যা ৪০। সময়ের সঙ্গে সমাজ ও অর্থনীতির পরিবর্তন হয়েছে। ফলে সেই পরিবর্তন বুঝতে তথ্যের প্রয়োজনও বেড়েছে।
তবে জনগণনার তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণনায় একজন ব্যক্তি মূলত বৃহত্তর একটি পরিসংখ্যানের অংশ। যেমন, কোনও ব্যক্তি কীভাবে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একটি শহর, জেলা বা রাজ্যের সামগ্রিক যাতায়াতের প্রবণতা বোঝার ক্ষেত্রে। সেই কারণেই জনগণনার তথ্য সাধারণত ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে আলাদা রেখে সামগ্রিক পরিসংখ্যান তৈরিতে ব্যবহার
করা হয়।
এখানেই এবারের জনগণনা নিয়ে কিছু স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠেছে। মোবাইল নম্বর, আধার নম্বর বা পাসপোর্টের মতো নির্দিষ্ট পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য কেন জনগণনার প্রশ্নপত্রে প্রয়োজন, তার যথেষ্ট ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের সামনে থাকা দরকার। কোনও ব্যক্তির পাসপোর্ট রয়েছে কি না, তা জানা হয়তো জনসংখ্যার একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই পাসপোর্টের নির্দিষ্ট নম্বর কেন নথিভুক্ত করতে হবে, সেটি আলাদা প্রশ্ন।
সরকার অবশ্যই বলেছে, জনগণনার তথ্য গোপন রাখা হবে এবং নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা থাকবে। এই আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। আধার-সংক্রান্ত তথ্যের অপব্যবহারের অভিযোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে তথ্যভাণ্ডারে অননুমোদিত প্রবেশ বা তথ্য ফাঁসের ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এবারের জনগণনা সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে হওয়ার ফলে বিপুল সংখ্যক মোবাইল ফোন ও ট্যাবলেটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হবে। ফলে তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।
এখানে সরকারের প্রতি অযথা সন্দেহ প্রকাশের প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং যথাযথ নিশ্চয়তা। জনগণনার মতো একটি বৃহৎ জাতীয় কর্মসূচিতে কোন তথ্য কেন নেওয়া হচ্ছে, সেই যুক্তি নাগরিকদের সামনে স্পষ্ট থাকলে আস্থাও বাড়বে। কোন তথ্য বাধ্যতামূলক, কোনটি ঐচ্ছিক এবং তথ্য কত দিন ও কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে— এসব বিষয়েও সহজ ভাষায় জানানো যেতে পারে।
কারণ, আলাদা আলাদা তথ্যের চেয়ে বিভিন্ন তথ্য এক জায়গায় যুক্ত হলে তার মূল্য এবং ঝুঁকি দুটোই বাড়ে। জনসংখ্যা, বয়স, শিক্ষা, ঠিকানা, যোগাযোগের তথ্যের সঙ্গে আধার, পাসপোর্ট বা ভোটার পরিচয়ের মতো নির্দিষ্ট তথ্য যুক্ত হলে একজন নাগরিকের সম্পর্কে অত্যন্ত বিস্তারিত ধারণা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। প্রযুক্তির ভাষায় এ ধরনের তথ্য একত্র করে কোনও ব্যক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল তৈরির সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা যায় না।
তাই জনগণনার মূল উদ্দেশ্য যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়, আবার নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাও যেন প্রশ্নের মুখে না পড়ে— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি। প্রয়োজনীয় তথ্য অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে, কিন্তু প্রতিটি তথ্যের প্রয়োজনীয়তার যুক্তিও স্পষ্ট হওয়া উচিত।
জনগণনা রাষ্ট্রের প্রয়োজন, কিন্তু একই সঙ্গে এটি নাগরিকেরও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। তাই তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য না নেওয়ার নীতি— এই তিনটি বিষয়েই স্পষ্টতা থাকলে জনগণনার প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। শেষ পর্যন্ত উন্নত প্রশাসনের জন্য তথ্য যেমন দরকার, তেমনই সেই তথ্যের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করাও একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কর্তব্য।
জনগণনা ও ব্যক্তিগত তথ্য
file pic