বর্ষা এলেই একদিকে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টির খবর, অন্যদিকে বছরের অন্য সময়ে পানীয় জলের সংকট— এই দুই বিপরীত চিত্র আজ ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হল, যে দেশে বর্ষাকালে আকাশ থেকে বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসে, সেই দেশেই কেন বছরের একটি বড় সময়ে মানুষকে জলসংকটের মুখোমুখি হতে হয়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়, আমাদের জল ব্যবস্থাপনার দিকে তাকাতে হবে।
জল প্রকৃতির দান হলেও নিরাপদ ও পর্যাপ্ত জল মানুষের জন্য নিশ্চিত হয় না শুধুমাত্র বৃষ্টির উপর নির্ভর করে। বৃষ্টির জল কোথায় পড়ছে, কতটা মাটির ভিতরে প্রবেশ করছে, কতটা জলাশয়ে জমছে এবং কতটা দ্রুত নিকাশি ব্যবস্থার মাধ্যমে নদী বা সমুদ্রে চলে যাচ্ছে—এসবের উপর একটি অঞ্চলের জলনিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভরশীল। অথচ আমাদের নগর ও গ্রামাঞ্চলের জল ব্যবস্থাপনায় এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
শহরাঞ্চলে সমস্যাটি আরও প্রকট। রাস্তা, ফুটপাত, বাড়ি, শপিং কমপ্লেক্স ও অন্যান্য নির্মাণের ফলে মাটির খোলা অংশ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ফলে বৃষ্টির জল মাটিতে ঢোকার পরিবর্তে পাকা নর্দমা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় সামান্য বেশি বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, অথচ সেই জলই কয়েক মাস পর ভূগর্ভস্থ জলের অভাবের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ একই জল এক সময়ে ‘অতিরিক্ত’ এবং অন্য সময়ে ‘অপ্রতুল’ হয়ে উঠছে।
গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বহু প্রাচীন পুকুর, দিঘি, খাল ও জলাভূমি নানা কারণে সংকুচিত বা ভরাট হয়েছে। যে জলাশয়গুলি একসময় বর্ষার জল ধরে রাখত এবং ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে পুনর্ভরণ করত, সেগুলির সংখ্যা কমে যাওয়ায় বৃষ্টির জল ধরে রাখার স্বাভাবিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। জলাশয় সংরক্ষণ তাই কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি ভবিষ্যতের জলনিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূগর্ভস্থ জলের উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা। কৃষি, শিল্প, গৃহস্থালি— বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন বাড়ছে। কিন্তু যে হারে জল তোলা হচ্ছে, সেই হারে যদি ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণ না হয়, তাহলে জলস্তর ক্রমশ নেমে যাওয়াই স্বাভাবিক। অনেক অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে কুয়ো বা নলকূপে জল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ার পেছনে এই ভারসাম্যহীনতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সময়কাল ও ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীনতা— এই দুই পরিস্থিতি একই অঞ্চলে দেখা দিতে পারে। ফলে শুধু ‘কত মিলিমিটার বৃষ্টি হল’— এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়, সেই বৃষ্টির জল আমরা কতটা ধরে রাখতে পারলাম, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই রেনওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টির জল সংরক্ষণকে জল ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা দরকার। বাড়ির ছাদ থেকে নেমে আসা জল সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা যায় অথবা উপযুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূগর্ভে প্রবেশ করানো যায়। স্কুল, কলেজ, সরকারি ভবন, হাসপাতাল, আবাসন ও বড় বাণিজ্যিক ভবনগুলিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে স্থানীয় জলসম্পদের উপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তবে শুধু বড় বড় প্রকল্প করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। জল ব্যবস্থাপনার মূলনীতি হতে হবে— ‘স্থানীয় জল স্থানীয়ভাবে ধরে রাখা’। গ্রামের পুকুর পুনরুদ্ধার, খাল সংস্কার, জলাভূমি রক্ষা, ছোট জলাধার তৈরি এবং কৃষিজমিতে জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা একই সঙ্গে করতে হবে। শহরেও নতুন নির্মাণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জল মাটিতে প্রবেশের সুযোগ রাখা দরকার।
এখানে প্রশাসনের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়। বাড়ির কল খোলা রেখে জল অপচয় করা, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভূগর্ভস্থ জল তোলা কিংবা জলাশয়কে আবর্জনার স্তূপে পরিণত করা— এসব অভ্যাস বদলানো জরুরি। জলকে সীমাহীন সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
একই সঙ্গে জল ব্যবস্থাপনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক। কোন অঞ্চলে কত বৃষ্টি হয়, কত জল ভূগর্ভে প্রবেশ করছে, কত জল উত্তোলন করা হচ্ছে এবং কোথায় জলস্তর কমছে— এই তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রযুক্তি, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং-এর মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে জলসম্পদের মানচিত্র তৈরি ও জলসংকটপ্রবণ অঞ্চল চিহ্নিত করা সম্ভব। স্থানীয় স্তরে এই তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করলে সরকারি অর্থের অপচয়ও কমবে।
জলসংকট মোকাবিলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জল ব্যবহারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ। পানীয় জল, কৃষি, শিল্প ও অন্যান্য ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে ভবিষ্যতে সংঘাত বাড়তে পারে। তাই জলকে শুধু একটি পণ্য হিসেবে নয়, একটি মৌলিক প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সামাজিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, বৃষ্টির জলকে ‘নিকাশি সমস্যা’ হিসেবে দেখার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। বর্ষার জল যত দ্রুত সম্ভব শহর বা গ্রাম থেকে বের করে দেওয়াই যদি একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে সেই জলকে সম্পদে পরিণত করার সুযোগ নষ্ট হবে। বরং যেখানে সম্ভব, বৃষ্টির জল ধরে রাখতে হবে, মাটিতে প্রবেশ করাতে হবে এবং স্থানীয় জলাধারগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
জলসংকটের সমাধান তাই কেবল নতুন পাইপলাইন, নতুন জল প্রকল্প বা দূরবর্তী উৎস থেকে জল এনে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত সমাধান শুরু হতে পারে আমাদের পায়ের নিচের মাটি এবং মাথার উপর থেকে নেমে আসা বৃষ্টির জলকে ঘিরে। যে জল প্রতিবছর আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়, তাকে যদি আমরা সংরক্ষণ করতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতের জলসংকটের জন্য কেবল প্রকৃতিকে দায়ী করা অন্যায়। বৃষ্টির জল আমাদের কাছে বোঝা নয়, সম্পদ। সেই সম্পদকে ধরে রাখার ক্ষমতাই আগামী দিনের জলনিরাপত্তার অন্যতম মাপকাঠি।