ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের সাহসের স্বীকৃতি

Image: SNS

আকাশে ওড়ার সময় একটি যাত্রীবাহী বিমানের ককপিটে যদি আচমকা সহ-পাইলটই মূল পাইলটের উপর হামলা করেন, তার চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? কয়েকশো যাত্রীর জীবন তখন নির্ভর করে একজন মানুষের উপস্থিত বুদ্ধি, সাহস এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার উপর। এমনই এক কঠিন পরিস্থিতিতে অসাধারণ সাহস ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন ফ্লাইদুবাইয়ের ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। তাঁর সাহসী ভূমিকা আজ শুধু ভারত বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হচ্ছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে আচমকাই ককপিটের ভিতরে ক্যাপ্টেন স্মিতের উপর হামলা করেন তাঁর সহ-পাইলট। তদন্তে ঘটনাটিকে সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে। হামলার ফলে বিমানটি কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে প্রায় ১৭ হাজার ফুটে নেমে আসে। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু সেই মুহূর্তে স্মিত যে ভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি সামলেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। শেষ পর্যন্ত যাত্রীরা ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে আটক করেন এবং বিমানটি সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করে।

এই ঘটনার পর ক্যাপ্টেন স্মিতের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। শনিবার হাসপাতালে স্মিতের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি তাঁকে ‘ইজরায়েলের হিরো’, ‘ভারতের হিরো’ এবং ‘গোটা দুনিয়ার হিরো’ বলে অভিহিত করেছেন। শুধু প্রশংসাতেই থেমে থাকেননি তিনি। আগামী বছর ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ক্যাপ্টেন স্মিতকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ঐতিহ্যবাহী মশাল জ্বালানোর সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেছেন। ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবসে এই মশাল প্রজ্জ্বলন দেশের সর্বোচ্চ সম্মানগুলির অন্যতম।


দুবাইয়ের যুবরাজ শেখ হামদান বিন মহম্মদ বিন রশিদ আল মক্তুমও হাসপাতালে গিয়ে স্মিতের সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি ভারতীয় পাইলটের সাহসকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, স্মিত সাহস, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের জীবনের প্রতি গভীর যত্নের সর্বোচ্চ পরিচয় দিয়েছেন। ভারতীয় দূতাবাসও জানিয়েছে, স্মিত সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং তাঁর চিকিৎসা ও যত্নের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।

এই স্বীকৃতির তাৎপর্য যথেষ্ট গভীর। কারণ এটি কোনও একটি দেশের নাগরিককে অন্য একটি দেশের পক্ষ থেকে দেওয়া নিছক প্রশংসা নয়। একজন পাইলট নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে সাহস দেখিয়েছেন, তা জাতি, ধর্ম বা দেশের সীমারেখাকে অতিক্রম করেছে। বিমানের যাত্রীদের মধ্যে কে ভারতীয়, কে ইজরায়েলি, কে আরব—সেই হিসাব করার সুযোগ তাঁর ছিল না। প্রত্যেকটি জীবনই তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একজন পেশাদার পাইলটের দায়িত্ববোধের এটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।

ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সন্ত্রাসবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমাজের একসঙ্গে দাঁড়ানো। সহ-পাইলটের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত এখনও চলছে। তাঁর পূর্ববর্তী আচরণ ও উগ্র মতাদর্শ সম্পর্কেও বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। একই সঙ্গে বিমান নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনও ধরনের চরমপন্থী প্রবণতা যাতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে না আনে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।

ক্যাপ্টেন স্মিতের ঘটনা আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়— সংকটের মুহূর্তে প্রশিক্ষণ, আত্মসংযম এবং দায়িত্ববোধ কত মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। তাঁর সাহসের প্রশংসা যেমন প্রাপ্য, তেমনই বিমানের যাত্রীদের দ্রুত পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতাও গুরুত্বপূর্ণ।

আজ যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে হিংসা, সংঘাত ও অবিশ্বাস বাড়ছে, তখন ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের সাহস একটি ভিন্ন বার্তা বহন করে। মানুষের জীবন রক্ষা, দায়িত্ব পালন এবং বিপদের মুখে মানবিকতার পাশে দাঁড়ানোই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। সেই কারণেই স্মিতের সাহস শুধু একজন পাইলটের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, এটি মানবিকতারও জয়।