আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধে কানাডার হাতেও আছে পাল্টা আঘাতের অস্ত্র

Photo: BBC

আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে কানাডাকে প্রথম দেখায় দুর্বল পক্ষ বলেই মনে হতে পারে। কানাডার পণ্য রপ্তানির বিপুল অংশের গন্তব্য আমেরিকা। ফলে সীমান্তের ওপারে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে সংঘাতে গেলে কানাডার অর্থনীতিতেও যে চাপ পড়বে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানেই হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। আমেরিকাও কানাডার ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। তাই শুল্কের লড়াই যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধু কানাডাই নয়, আমেরিকার বহু অঙ্গরাজ্য, শিল্প এবং সাধারণ ভোক্তাও তার মূল্য দিতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সামনে তাই সহজ পথ নেই। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি, অন্যদিকে একতরফা চাপের কাছে নতিস্বীকার করলে দেশের মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। ইতিমধ্যেই কানাডার জনমতের বড় অংশ মনে করছে, আমেরিকার চাপের মুখে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া উচিত নয়।

কানাডার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং আমেরিকার সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক। আমেরিকার ২৬টি অঙ্গরাজ্যের জন্য কানাডা সবচেয়ে বড় বিদেশি ক্রেতা। আরও ১৯টি অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রেও কানাডা শীর্ষ তিনটি রপ্তানি বাজারের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ কানাডার বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিলে তার প্রভাব ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যের ব্যবসা ও শ্রমবাজারেও তার অভিঘাত পড়বে।

কার্নি ইতিমধ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইস্পাত, কৃষি সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিন পণ্য, কাগজ, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং কিছু কৃষিপণ্যকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। উদ্দেশ্য শুধু আমেরিকাকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং এমন পণ্য বেছে নেওয়া, যেগুলিতে মার্কিন ব্যবসা ও উৎপাদকরা কানাডার বাজারের ওপর নির্ভরশীল।


তবে কানাডার হাতে আরও বড় অস্ত্র রয়েছে— জ্বালানি। আমেরিকা কানাডা থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ আমদানি করে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী কয়েকটি মার্কিন অঙ্গরাজ্যের জন্য কানাডার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কানাডা যদি এই ক্ষেত্রকে পাল্টা চাপ তৈরির জন্য ব্যবহার করে, তাহলে তার প্রভাব দ্রুত আমেরিকার শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে যেতে পারে।

অবশ্য কানাডা এখনই জ্বালানিকে প্রধান পাল্টা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে না। কারণ এমন পদক্ষেপ কানাডার অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কানাডার বিভিন্ন প্রাদেশিক নেতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রয়োজনে এই বিকল্প পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। অন্টারিওর মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ড তো বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত মাশুল বসানোর কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন।

জ্বালানি ছাড়াও কানাডার হাতে রয়েছে কৃষি ও খনিজ সম্পদের শক্তিশালী হাতিয়ার। সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পটাশের ক্ষেত্রে কানাডা বিশ্বের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। আমেরিকার কৃষি উৎপাদন এই পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কানাডা যদি পটাশের সরবরাহ কমিয়ে দেয়, তার প্রভাব শুধু কৃষি ব্যবসায় নয়, শেষ পর্যন্ত আমেরিকার খাদ্যবাজারেও পড়তে পারে।

একই কথা প্রযোজ্য লিথিয়াম, নিকেল, গ্রাফাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রেও। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং আধুনিক শিল্পে এসব খনিজের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে এই সম্পদগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা যখন চিনের মতো দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে, তখন কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীকে উপেক্ষা করা তার জন্য সহজ নয়।

কানাডা ইতিমধ্যেই আর একটি ক্ষেত্রে আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে ভোক্তাদের আচরণের মাধ্যমে। আমেরিকার প্রথম দফার শুল্কের পর কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের উদ্যোগে মার্কিন মদ ও ওয়াইন বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। এর ফলে আমেরিকার পানীয় শিল্প বড় বাজার হারায়। কানাডায় মার্কিন ওয়াইনের রপ্তানি একসময় বিপুল হারে কমে যায়। অর্থাৎ একটি দেশের সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় প্রশাসন চাইলে বাণিজ্যনীতির বাইরেও অন্য দেশের ব্যবসায়িক স্বার্থে চাপ তৈরি করতে পারে।

পর্যটন ক্ষেত্রেও একই ছবি। অনেক কানাডীয় নাগরিক আমেরিকা ভ্রমণ কমিয়ে দিয়েছেন। এতে আমেরিকার সীমান্তবর্তী শহর, হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান এবং পর্যটন ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে। কানাডার মানুষ যদি আমেরিকায় যাওয়ার পরিবর্তে নিজেদের দেশেই অর্থ ব্যয় করেন, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমেরিকার পরিষেবা অর্থনীতিতে।।এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে কানাডার মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু আমেরিকার সাধারণ মানুষও শুল্কের মূল্য দেবেন। বিদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর শেষ পর্যন্ত আমদানিকারক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। গাড়ি, নির্মাণসামগ্রী, কৃষিপণ্য কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা পণ্যের দাম বাড়তে পারে। মূল্যবৃদ্ধি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক দায়ও শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই পড়ে।
আর এই সময়টাই গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। অর্থনীতি সেখানে ভোটারদের অন্যতম প্রধান চিন্তার বিষয়। মিশিগান ও মেইনের মতো কানাডা-সংলগ্ন অঙ্গরাজ্যগুলিতে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব রাজ্যের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে কানাডা কেবল প্রতিবেশী দেশ নয়, একটি বিশাল বাজার।

অতএব কানাডা চাইলে সরাসরি আমেরিকার কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ না করেও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। কোন পণ্যে পাল্টা শুল্ক বসবে, কোন রাজ্যের শিল্প বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং কোথায় জনমতের অসন্তোষ বাড়তে পারে— এই হিসাব কানাডার নীতিনির্ধারকদের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা তুলে দেয়।

তবে কানাডারও সীমাবদ্ধতা আছে। আমেরিকার ওপর তার অর্থনৈতিক নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যযুদ্ধ কানাডার অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই প্রতিশোধের মাত্রা বাড়াতে গিয়ে নিজের অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলা কানাডার পক্ষে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

এই কারণেই কানাডার সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ সম্ভবত সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধ নয়, বরং হিসেবি পাল্টা আঘাত। এমন পণ্যে চাপ সৃষ্টি করা, যেখানে আমেরিকার নির্দিষ্ট শিল্প ও অঙ্গরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে; প্রয়োজনে জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো কৌশলগত সম্পদের ব্যবহার নিয়ে সতর্ক সংকেত দেওয়া এবং একই সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখা— এই কৌশলই বেশি কার্যকর হতে পারে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি যদি কানাডাকে ভয় দেখিয়ে দ্রুত ছাড় আদায়ের চেষ্টা হয়, তাহলে সেই কৌশল কতটা সফল হবে তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট— কানাডা যতটা দুর্বল বলে মনে হয়, বাস্তবে তার হাতে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্থনৈতিক অস্ত্র রয়েছে।
বাণিজ্যযুদ্ধে শক্তি শুধু অর্থনীতির আকারে নির্ধারিত হয় না। নির্ভরশীলতার জায়গাগুলিই অনেক সময় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। আমেরিকার বিশাল বাজার কানাডার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই কানাডার জ্বালানি, খনিজ, কৃষি সম্পদ এবং বাজার আমেরিকার বহু শিল্পের জন্য অপরিহার্য।

তাই এই লড়াই যদি আরও দীর্ঘ হয়, প্রশ্নটা আর শুধু কে কাকে কত শতাংশ শুল্ক চাপাল, সেখানে আটকে থাকবে না। আসল প্রশ্ন হবে— কোন দেশ কতটা বেশি সময় ধরে অন্য দেশের ওপর তৈরি নিজের নির্ভরতা সামলাতে পারে। আর সেই পরীক্ষায় কানাডাকে একেবারেই অসহায় প্রতিপক্ষ ধরে নেওয়া হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের বড় ভুল হতে পারে।