রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব যদি ককরোচ জনতা পার্টির হাতে যায়, তা হলে এই দলের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। কারণ, কংগ্রেস দল সম্পর্কে দেশের লোকের ধারণা যতটুকু আছে, তাতে এই দলের ভিত্তি বড়ই নড়বড়ে। কারণ, কংগ্রেস পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই করেছিল, তা অতি জটিল। কারণগুলি নিম্নে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরবার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ক) জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনের সময় ত্রিপুরী অধিবেশন চলাকালীন ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু দ্বিতীয়বার ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন পট্টভি সীতারামাইয়াকে হারিয়ে। মোহনদাস গান্ধী নেতাজির এই বিজয়কে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন— সীতারামাইয়ার পরাজয়, আমার পরাজয়। পরে নেতাজি কংগ্রেস সভাপতির পদ ছেড়ে দেন এবং নিজে ফরওয়ার্ড ব্লক নামে একটি নতুন দল গঠন করেছিলেন। তারপর থেকেই কংগ্রেসের পতন শুরু হতে থাকে।
খ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। বরং নেতাজি দেশের বাইরে চলে গিয়ে প্রথমে জার্মানি এবং পরে জাপানি বাহিনীর সাহায্য নিয়ে ও রাসবিহারী বসু প্রতিষ্ঠিত আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল তারিখে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করে মণিপুরের মৈরাংয়ে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষের বুকে প্রথমবার স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উড়িয়েছিলেন।
ফলে এই সময়ে দেশবাসী কংগ্রেসের নিষ্ক্রিয়তার পর্যাপ্ত উদাহরণ প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হয়েছিল। ফলে দেশবাসী কংগ্রেসের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করেছিল।
গ) নেতাজি পরবর্তীকালে ‘দিল্লি চলো’ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন, যেটা ছিল ইংরেজ সরকারের বিরোধিতায় প্রত্যক্ষ যুদ্ধ। নেতাজির আহ্বানে দেশবাসী উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। পরবর্তীকালে প্রকৃতির বিরোধিতায় নেতাজি কোহিমা দখল করতে ব্যর্থ হওয়ায় পুনরায় তিনি আজাদ হিন্দ বাহিনীকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রস্তুত করতে সিঙ্গাপুরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। নেতাজির অসাধারণ দেশপ্রেম এবং একজন দক্ষ সেনানায়ককে দেখে দেশবাসী কংগ্রেসের কথা ভুলতেই বসেছিল। এর পরে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ ও ৯ আগস্ট পরপর দু’দিন দুটি পরমাণু বোমার আঘাতে হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহর দুটির ধ্বংস হওয়ার পরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। এর ঠিক নয় দিন বাদে, ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে জাপানের তাইহোকু বিমানবন্দরে একটি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং সেই বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু হয়েছে বলে কংগ্রেস দলনেতা জওহরলাল নেহরু এবং মোহনদাস গান্ধী দেশবাসীর জন্য প্রচার করেন। অথচ পরে জানা গিয়েছিল, নেতাজির মৃত্যুর ঘটনাটি সর্বৈব মিথ্যা।
এর বহুকাল আগেই, ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ নিখিল ভারত মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই কংগ্রেসের মধ্যে ভাঙন শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরে নেতাজির ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠনের সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙন শুরু হওয়ার আগেই, ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর নাগপুরে কেবি হেডগেওয়ার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করার ফলেও কংগ্রেসের পতন শুরু হয়েছিল। এর পরে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ২১ অক্টোবর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দিল্লিতে ভারতীয় জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও কংগ্রেসের ভাঙন শুরু হয়।
ঘ) ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পরবর্তীকালে প্রথম তিনটি লোকসভার সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস জয়লাভ করলেও জওহরলাল নেহরুর দুটি ভুল পদক্ষেপে ভারতবর্ষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জয়লাভের পরেও তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পাকিস্তানের প্রতি দরদ দেখিয়ে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের অংশটি পাকিস্তানের হাতে তুলে দেন এবং সেই ভুলের মাশুল এখনও ভারতকে গুনতে হচ্ছে। দ্বিতীয় ভুল হলো ৩৭০ ধারা প্রয়োগ করে জম্মু ও কাশ্মীরে বিশেষ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা। ১৯৫১ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে তৎকালীন জনসঙ্ঘ নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রহস্যমৃত্যু ঘটেছিল।
কংগ্রেসের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে লোকেরা কংগ্রেসের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এর পরে জওহরলাল নেহরুর সরকারের ভুল বিদেশনীতি অনুসরণ করে চিনের সঙ্গে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ভারত এবং আকসাই চিনের মতো একটি বড় অংশ চিনের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। এভাবেই কংগ্রেসের ভুল সিদ্ধান্তের জন্যই ভারতের ও কংগ্রেস দলের হাল বেহাল হতে শুরু করে।
ঙ) ৯ জুন, ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে লালবাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বকালেই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এই যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১০ জানুয়ারি, তাশখন্দে। পরের দিন লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল এবং তখন খবর প্রচারিত হয়েছিল, তিনি হৃদ্রোগে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু এই মৃত্যু নিয়েও রহস্য তৈরি হয়৷ যাই হোক, এইসব ঘটনার পরে ধীরে ধীরে কংগ্রেসের প্রতি জনগণের আস্থা ক্রমশ কমতেই থাকে এবং কংগ্রেসের প্রতি লোকের আস্থা নষ্ট হয়।
চ) এর পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তিনি মোট প্রায় ১৫ বছর ৩৫০ দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রথম মেয়াদে ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬ থেকে ২৪ মার্চ ১৯৭৭ (১১ বছর ২ মাস) এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ১৪ জানুয়ারি ১৯৮০ থেকে ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪ (৪ বছর ৯ মাস)। এর মধ্যে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পরাজয় ঘটে এবং জনতা পার্টির মোরারজি দেশাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে অবশ্য ইন্দিরা গান্ধী ভোটে জয়লাভ করলেও তিনি ইন্দিরা কংগ্রেস নামে একটি নতুন দল গঠন করেছিলেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর তাঁর নিজের দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন।
ছ) এইভাবেই কংগ্রেসের প্রতি এ দেশের জনগণের আস্থা একেবারেই কমে যায়। পরবর্তীকালে রাজীব গান্ধী এবং পিভি নরসিংহ রাও দু’জনেই ইন্দিরা কংগ্রেস দলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীকালে জনতা দলের বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এর পরবর্তী কালে অটলবিহারী বাজপেয়ী ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তী কালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বলে দলটি থাকলেও ইন্দিরা কংগ্রেস দলটিই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল এবং এই দলের নেতা মনমোহন সিং আরও দশ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তারপর একটানা পঁচিশ বছর নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচিত যথাক্রমে মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হন৷ এখনও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে তিনি কর্মরত আছেন।
ফলে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের কংগ্রেসের বোধ হয় বিলুপ্তিসাধন ঘটে গেছে। আদি কংগ্রেসের প্রতীকচিহ্ন চরকা এবং স্বাধীনতার পরে জোড়া বলদ চিহ্নের অবসান ঘটে৷ এখন ইন্দিরা কংগ্রেসের হাত চিহ্নের স্বীকৃতি আছে। পনেরো থেকে কুড়ি বছর আগে এই বাংলায় ঘাসফুল ফুটেছিল। এ বছর ঘাসফুল শুকিয়ে গিয়ে পদ্মফুল ফুটেছে। ফলে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে হাত চিহ্ন সহজে শক্তিশালী হবে বলে মনে হয় না।