ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে যে চ্যালেঞ্জটি দাঁড়িয়ে আছে, তা নতুন কিছু নয়— বরং পুরোনো এক ধাঁধারই নতুন সংস্করণ– কীভাবে ধীরগতির অর্থনীতিকে আবার চাঙ্গা করা যায়, অথচ একই সঙ্গে জনতার প্রত্যাশা ও বাজারের আস্থা— দুই-ই বজায় রাখা যায়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বার্নহ্যামের পদক্ষেপগুলি এই দ্বৈত চাপে তাঁর অবস্থানকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। একদিকে সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে হাঁসফাঁস করছে; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা চাইছে সরকার দ্রুত বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা কমাক। এই দুই দাবির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যে কতটা কঠিন, তা ব্রিটেনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসই প্রমাণ করে।
বার্নহ্যাম যে লেবার পার্টির নেতা, সেই দল ঐতিহ্যগতভাবে কল্যাণমূলক নীতির পক্ষে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্রিটেনের সরকারি ঋণ ইতিমধ্যেই এমন স্তরে পৌঁছেছে, যা গত শতকের ষাটের দশকের পর আর দেখা যায়নি। এই অবস্থায় অতিরিক্ত খরচের প্রতিশ্রুতি দিলে তা বাজারে নেতিবাচক সংকেত পাঠাতে পারে— যার ফল হতে পারে সুদের হার বৃদ্ধি, মুদ্রার দুর্বলতা এবং আরও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
এই প্রেক্ষাপটে বার্নহ্যামের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর অর্থমন্ত্রী নির্বাচন। তিনি সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি-কে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। হিলি পূর্বে গর্ডন ব্রাউনের আমলে ট্রেজারিতে কাজ করেছেন এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার প্রতি তাঁর ঝোঁক সুপরিচিত। এই নিয়োগ স্পষ্টভাবে একটি বার্তা দেয়— সরকার খরচে লাগাম টানার ব্যাপারে সিরিয়াস।
তবে শুধু আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখলেই চলবে না। সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোও জরুরি। এই কারণেই বার্নহ্যাম সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর আরোপিত কর অন্তত ছ’মাসের জন্য তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে গড়ে প্রতি পরিবার বছরে প্রায় ৪৫ পাউন্ড সাশ্রয় করবে। পরিমাণটি খুব বড় না হলেও প্রতীকী দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় যে, সরকার অন্তত স্বল্পমেয়াদে হলেও জনগণের পাশে দাঁড়াতে চায়।
এখানে আরও একটি দিক লক্ষণীয়— এই করছাড়ের অর্থ জোগাড় করা হয়েছে অন্য একটি প্রকল্প বাতিল করে, অর্থাৎ ডিজিটাল আইডি চালুর পরিকল্পনা থেকে সরে এসে। এর মাধ্যমে সরকার বোঝাতে চেয়েছে যে, তারা অযথা ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি একটি ইতিবাচক সংকেত, কারণ তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় ‘অর্থহীন খরচ’-কে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই পদক্ষেপগুলি কি যথেষ্ট? ব্রিটেনের অর্থনীতির মূল সমস্যা শুধু সাময়িক মন্দা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা। উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি কম, বিনিয়োগের গতি ধীর এবং ব্রেক্সিট-পরবর্তী অনিশ্চয়তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র করছাড় বা ব্যয় সংকোচন দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বার্নহ্যামের সামনে তাই বড় কাজ হলো একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করা। পরিকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ— এসব ক্ষেত্রেই জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত করতে হবে, যাতে রাজস্ব বাড়ে কিন্তু অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ব্যাহত না হয়।
রাজনৈতিক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। জনসাধারণ দ্রুত ফল চায়, কিন্তু অর্থনৈতিক সংস্কারের ফল পেতে সময় লাগে। এই ব্যবধানটাই অনেক সময় সরকারকে বিপাকে ফেলে। বার্নহ্যাম যদি স্বচ্ছভাবে তাঁর পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা তৈরি করতে পারেন, তবে তিনি এই চাপ কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারবেন।
ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সামনে পথটি অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। তাঁকে একই সঙ্গে ‘জনমুখী’ এবং ‘বাজারমুখী’ হতে হবে, যা একধরনের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা। প্রথম কয়েকটি সিদ্ধান্তে তিনি যে সতর্কতা ও কৌশলের পরিচয় দিয়েছেন, তা আশাব্যঞ্জক। তবে প্রকৃত পরীক্ষাটি এখন শুরু। সময়ই বলে দেবে, তিনি পুরোনো এই অর্থনৈতিক ধাঁধার সমাধান খুঁজে পান কি না।