রক্তাক্ত মণিপুর

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

মণিপুরে হিংসাত্মক ঘটনা থামছেই না। ২০২৩ সালের ৩ মে থেকে শুরু হয়েছিল যে অশান্তি, আজও তা রাজ্যটিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষ এখনও ঘরছাড়া জীবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই ফের একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।

সম্প্রতি ময়াংলাম্বম রিশিকান্ত সিং নামের ২৯ বছরের এক মেইতেই যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি কুকি-জো অধ্যুষিত চূড়াচাঁদপুর জেলায় তাঁর স্ত্রীর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। মুখোশধারী বন্দুকধারীরা স্বামী-স্ত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। স্ত্রীকে ছেড়ে দিলেও রিশিকান্ত সিংকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের মেইতেই অধ্যুষিত ইম্ফল উপত্যকায় এবং কাকচিং এলাকায় বিক্ষোভ ছড়ায়। বিচার চেয়ে রাস্তা অবরোধও হয়।

এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, এটি মণিপুরের গভীর আস্থার সংকটের প্রতিফলন। মণিপুর বর্তমানে রাষ্ট্রপতির শাসনের অধীনে থাকলেও সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা কাজ করছে। পাহাড়ি অঞ্চল, যেখানে মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস এবং উপত্যকা, যেখানে মেইতেইরা সংখ্যাগরিষ্ঠ— এই দুই ভূখণ্ডের মধ্যেকার বিভাজন দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।


মণিপুর একটি বহু-জাতিগোষ্ঠীর রাজ্য। ১৯৭২ সালে রাজ্যের মর্যাদা পাওয়ার পর থেকে এখানে ৩৩টি স্বীকৃত উপজাতি রয়েছে। কুকি-জো, নাগা সম্প্রদায় যেমন আছে, তেমনই অ-উপজাতি মেইতেইরাও আছেন, যাঁদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় রয়েছে। অতীতে বিদ্রোহ, সশস্ত্র আন্দোলন এবং জাতিগত সংঘর্ষের পর্ব এলেও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করেছে, পাশাপাশি থেকেছে। আজ সেই সহাবস্থান প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

বর্তমান হিংসার সূত্রপাত হয় মণিপুর হাই কোর্টের একটি নির্দেশের পর। আদালত রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির মর্যাদা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে বলেছিল। এটি মেইতেইদের বহু পুরনো দাবি হলেও আদিবাসী গোষ্ঠীগুলি তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে মেইতেইরা শিক্ষা, চাকরি ও জমির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা পাবে। প্রতিবাদ দ্রুত হিংসাত্মক সংঘর্ষে পরিণত হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই সংকটে রাজ্য ও কেন্দ্র— উভয় সরকারের ভূমিকাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করলেও তাতে ক্ষত সারেনি। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা, দেরিতে হস্তক্ষেপ এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। মানুষ মনে করছে, রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, হিংসাত্মক ঘটনাগুলি এখন প্রতিশোধের চক্রে ঢুকে পড়ছে। একটি সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ মানেই অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভের সঞ্চার। রিশিকান্ত সিং-এর হত্যাকাণ্ড কুকি-অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ায় এই অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। তদন্তের দাবি, জাতীয় তদন্ত সংস্থার হাতে মামলা দেওয়ার আহ্বান, সবই সেই আস্থাহীনতার লক্ষণ।
মণিপুরে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করলেই হবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংবেদনশীল প্রশাসন এবং সর্বোপরি সংলাপ। নাগরিক সমাজ, আদিবাসী ও অ-আদিবাসী নেতৃত্ব— সব পক্ষকে একসঙ্গে বসতে হবে। পরিচয়, বঞ্চনা ও উন্নয়নের প্রশ্নগুলির ন্যায্য সমাধান ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়।

রক্তপাত কোনও সমস্যার সমাধান নয়। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড মণিপুরকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে। এখনই যদি বিশ্বাস ফেরানোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে এই ক্ষত প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেড়াতে হবে। মণিপুরের মানুষের প্রাপ্য শান্তি, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা— রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতেই হবে।