উজ্জ্বলকুমার দত্ত
পশ্চিম এশিয়ার আকাশ আজ মানুষের অপকর্মে ব্যথিত। অসীম লালসা, স্বার্থ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও নিজেকে ক্ষমতাধর দেখানোর প্রতিযোগিতায় দেশগুলি মেতেছে। প্রথম দুটি বিশ্বযুদ্ধ এই দেশগুলিকে মানবতার পাঠ শেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের হাহাকার ও দুর্দশা দেখেও এই দেশগুলির আত্মা কাঁপে না। নিষ্পাপ ছোট-ছোট শিশু পৃথিবীকে ঠিকভাবে বুঝে ওঠার আগেই পৃথিবী ছেড়ে তাদের চলে যেতে হল। মনে হয় ঈশ্বর তাদের ভুল করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। ঠিকই হল তারা অন্য কোন গ্রহলোকে পুনরায় শান্তিতে জন্ম নিতে পারবেন। কিন্তু তাদের স্মৃতির মধ্যে যদি এই ঘটনার স্মৃতি গেঁথে যায় তবে তাদের কোমল মনে পৃথিবীর প্রতি কেবল ঘৃণাই জন্মাবে!
রাষ্ট্রনায়কেরা নিজেদের ভগবানের থেকেও ঊর্ধ্বে মনে করেন। তাদের চালচলন ও সিদ্ধান্ত নেবার পদ্ধতি ভগবানকেও হার মানায়। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করা গ্রহগুলির মধ্যে পৃথিবী কেবল চিরসবুজ ও প্রাণের উৎসভূমি। সেই প্রাণকে লালসার আগুনে নিক্ষেপ করা তাদের অধিকার সীমা থেকে যোজন দূরত্বে। পৃথিবী পরিবর্তনশীল। অসংখ্য সভ্যতার ধাত্রীভূমি। ধরা এত কলঙ্ক ও স্পর্ধা সহ্য করে না। অত্যাচার, অনাচার চরমে পৌঁছালে কারোরই রক্ষা নেই। এক নিমেষে সব এলোমেলো করার ক্ষমতা পৃথিবীর আছে। কিন্তু এই রাষ্ট্রনায়কদের কে বোঝাবে?
প্রতিটি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন দেশ চুপ করে সব নির্দ্বিধায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। তারা ভয় ও ভীতিতে সন্ত্রস্ত। এ কোন পৃথিবীতে আমরা বাস করছি! এখানেই কি যীশুখ্রিস্ট গৌতম বুদ্ধ, হযরত মুহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন? সন্দেহ হয় তাঁদের বাণীগুলির কী হবে। তাঁরা যে শিক্ষায় দীক্ষিত করে গিয়েছিলেন সেগুলি আজ কোথায়? এত ধর্মের সংস্থান গোটা বিশ্বজুড়ে। তাঁরা কী করছেন? মানবতার এই দুর্যোগে তাঁদের চেহারাগুলো কোথায় যেন লুকিয়ে আছে।
সবাই কি তাহলে ভয় পেয়ে গেলেন— ভয় কীসের? একদিন তো সবাইকেই পরপারে যেতে হবে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাঁধে বন্দুক রেখে এক দেশ পৃথিবীর অন্য দেশগুলিকে তোয়াক্কা না করে কখনও স্বয়ংপ্রভুত্ব রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে উঠিয়ে নিয়ে জেলে বন্দী করে রাখছেন; কখনও আবার ইউরোপকে ধমকাচ্ছেন। গ্রীনল্যান্ড নিজের বলে দাবি করছেন। পৃথিবী যেন তার কাছে আত্মসমর্পণ করে করজোড়ে বসে আছে! এভাবে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মানবতা কত দিন টিকে থাকবে? ভয়ের আবহেই বা নিজেকে কীভাবে রক্ষা করা যায়?
এই আর্তনাদ শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়, এই আর্তনাদ গোটা পৃথিবীজুড়ে। যুদ্ধ আজ আর সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না— তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনোজগতে ও সভ্যতার নৈতিক কাঠামোয়। রাষ্ট্রের শক্তি আজ মানুষের জীবনের মূল্যকে ছাপিয়ে গেছে। ‘জাতীয় স্বার্থ’-এর নামে যে রাজনীতি চালানো হয়, সেখানে শিশু, নারী, বৃদ্ধ— সবাই কেবল পরিসংখ্যান।
বোমার আঘাতে ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি, কিন্তু তার চেয়েও ভয়াবহভাবে ধ্বংস হয় মানুষের বিশ্বাস। এই পৃথিবী হয়তো থাকার যোগ্য আর নেই।
বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একদিন সভ্যতা উপলব্ধি করেছিল যে, যুদ্ধ কখনও শেষ কথা হতে পারে না। মানুষের রক্তে লেখা সেই কঠিন শিক্ষারই ফল হিসেবে জন্ম নিয়েছিল শান্তির নতুন ভাষা, মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র এবং বিশ্ববিবেকের প্রতীক বলে বিবেচিত রাষ্ট্রসঙ্ঘ। উদ্দেশ্য ছিল একটাই— শক্তির উন্মত্ততাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পৃথিবীকে আরেকটি সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে সেই প্রতিষ্ঠান আজ তার আদর্শগত দীপ্তি হারাতে বসেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ ক্রমশ পরিণত হয়েছে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক ছাতায়, যেখানে ন্যায়বিচার প্রায়ই ক্ষমতার দরজায় মাথা নত করে। ভেটোর রাজনীতি মানবতার কণ্ঠরোধ করে দেয়। সত্যের বদলে প্রতিষ্ঠা পায় শক্তির ভাষা। যার হাতে অস্ত্র বেশি, যার প্রভাব বিস্তৃত— তার বক্তব্যই যেন চূড়ান্ত সত্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রসংঘ সভ্যতার বিবেকের এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধর্ম, যা একদিন মানুষের ভেতরে করুণা, সহানুভূতি ও সংযম জাগিয়ে তুলত, আজ বহু জায়গায় নীরব দর্শক। মন্দির, মসজিদ, গির্জা— সবাই যেন নিজেদের নিরাপদ চার দেয়ালের ভেতর বন্দি। মানবতার প্রশ্নে তারা স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলছে না। অথচ যীশুখ্রিস্ট বলেছিলেন— প্রতিবেশীকে ভালোবাসো। গৌতম বুদ্ধ শিখিয়েছিলেন— করুণাই ধর্ম। হযরত মুহাম্মদ বলেছিলেন— একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণনাশ সমগ্র মানবতার হত্যার সমান। আজ এই বিবেক বাণীগুলো কেবল ধর্মগ্রন্থের পাতায় আটকে আছে অথচ জীবনের রক্তাক্ত বাস্তবতায় তাদের কোনো প্রতিফলন নেই। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির আচরণ আজ ঔপনিবেশিক অহংকারকেও হার মানায়। পৃথিবীকে তারা যেন দাবার বোর্ড ভেবে নিয়েছে। দেশগুলো কেবলই ঘুঁটি।
এই ভয়ের সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে সাধারণ মানুষের। যারা যুদ্ধ চায় না, ক্ষমতা চায় না, শুধু একটু শান্তিতে বাঁচতে চায়— তারাই সবচেয়ে অসহায়। শিশুরা স্কুলের পাঠ্যসূচি বোঝা বা চেনার আগেই শিখছে বোমার শব্দ চিনতে। মায়েরা জানে না রাতের শেষে সন্তান বেঁচে থাকবে কি না। এই বাস্তবতায় ‘উন্নয়ন’, ‘সভ্যতা’, ‘প্রগতি’— এই শব্দগুলো নিছক বিদ্রুপ ছাড়া আর কী!
তবু ইতিহাস বলে, অত্যাচারেরও একটি সীমা আছে। পৃথিবী দীর্ঘদিন কলঙ্ক বহন করে না। যখন অন্যায় চরমে ওঠে, তখনই পরিবর্তনের বীজ অঙ্কুরিত হয়। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি আসে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে, তবে তার মূল্য চুকাতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। তাই প্রশ্ন উঠে আসে— আমরা কি সেই অপেক্ষাই করছি? নাকি এখনই প্রতিবাদী মানবতার কণ্ঠকে শক্ত করব?
প্রতিটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাষ্ট্র, প্রতিটি সচেতন নাগরিক, প্রতিটি নৈতিক কণ্ঠের দায়িত্ব আছে। নীরবতা আজ নিরপেক্ষতা নয়, নীরবতা আজ অন্যায়ের সহযাত্রী। ভয়কে অতিক্রম না করলে মানবতা বাঁচবে না। শক্তির কাছে মাথা নত করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
এই পৃথিবী কেবল রাষ্ট্রনায়কদের নয়। এই পৃথিবী নিষ্পাপ শিশুদের, শ্রমিকের ঘামের, মায়ের আশীর্বাদের। সূর্যকে প্রদক্ষিণ করা এই একমাত্র জীবন্ত গ্রহ আমাদের যৌথ উত্তরাধিকার। তাকে লালসার আগুনে নিক্ষেপ করার অধিকার কারও নেই। আজ যদি মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো না যায়, তবে আগামীকাল ইতিহাস আমাদের নাম লিখবে নীরব অপরাধীদের তালিকায়।
প্রশ্নটা তাই খুব সোজা— ভয়ের সঙ্গে বাঁচব, না মানবতার সঙ্গে? উত্তরটা রাষ্ট্রনায়কদের নয়, শেষ পর্যন্ত আমাদেরই দিতে হবে।