পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে শিল্পায়ন যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কৃষি ও পরিষেবা ক্ষেত্রের পাশাপাশি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে না পারলে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব কমানো, পরিকাঠামোর উন্নতি এবং মানুষের আয় বাড়ানোর জন্য নতুন শিল্পের প্রয়োজন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষিত এই নীতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে শিল্পের প্রসার এবং বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
নতুন শিল্পনীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে আর্থিক প্রণোদনাকে যুক্ত করা। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলি যাতে বেশি সংখ্যায় কর্মী নিয়োগে উৎসাহিত হয়, তার জন্য নিয়োগকর্তাদের দেওয়া কর্মচারী ভবিষ্যনিধি বা ইপিএফের অর্থের একটি অংশ সরকার ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মহিলা ও রূপান্তরকামী কর্মীদের জন্য নিয়োগকর্তার ইপিএফের ১০০ শতাংশ এবং পুরুষ কর্মীদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দশ বছর ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর ফলে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণও উৎসাহিত হবে।
পরিষেবা ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। ২০০-র বেশি কর্মী নিয়োগকারী যোগ্য পরিষেবা সংস্থাগুলি মহিলা কর্মীদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ এবং পুরুষ কর্মীদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ইপিএফ ফেরত পাবে। অন্যদিকে বড় শিল্প ও মেগা প্রকল্পের জন্যও কর্মী নিয়োগের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত ৫০ শতাংশ ইপিএফ ফেরতের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ সরকার শুধু শিল্প স্থাপনের কথা বলছে না, শিল্পের সঙ্গে মানুষের কাজের সম্পর্ককেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই নীতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রাজ্যের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলিকে শিল্পের মানচিত্রে নিয়ে আসার চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা ও তার আশপাশের কয়েকটি অঞ্চলে শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রের অধিকাংশ বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে রাজ্যের বহু জেলা পর্যাপ্ত শিল্পের সুযোগ পায়নি। নতুন নীতিতে শিল্প ও পরিকাঠামোর বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে পিছিয়ে থাকা মহকুমাগুলিকে অগ্রাধিকার অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে বাড়তি আর্থিক সুবিধা এবং কিছু কর্মসংস্থান সংক্রান্ত শর্তে ছাড় দেওয়া হবে। এর ফলে জেলা স্তরে শিল্পের বিকাশ, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নতুন শিল্পনীতিতে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, গ্রিন হাইড্রোজেন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বস্ত্র, ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রগুলিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে এই শিল্পগুলির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। তাই এখন থেকেই এই ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারলে পশ্চিমবঙ্গ ভবিষ্যতের শিল্প প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।
শিল্পের প্রসারে শুধু জমি বা কর ছাড় যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিদ্যুৎ, জল, রাস্তা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বড় শিল্পপ্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরিতে সরকারি সহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। উৎপাদন শুরু হওয়ার পর নির্দিষ্ট নিয়মে বিভিন্ন পর্যায়ে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এই শিল্পনীতির সাফল্য নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের ওপর। বিনিয়োগের ঘোষণা যেন কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন শিল্পনীতি পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। শিল্পের বিকাশ হলে শুধু বড় শহর নয়, জেলা ও মফস্বলের অর্থনীতিও উপকৃত হবে। তরুণ প্রজন্মের সামনে কাজের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। নতুন শিল্পনীতিকে তাই শুধু সরকারি ঘোষণা হিসেবে নয়, বাংলার অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের একটি সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।