পশ্চিমবঙ্গে সদ্য পাস হওয়া ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশাল অ্যাকটিভিজ বিল, ২০২৬’, সাধারণ কথ্য ভাষায় ‘গুন্ডাদমন আইন’, নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত আইনগত পদক্ষেপ। আইনটির মূল লক্ষ্য গুন্ডামি ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ— এই নিয়ে সমাজে খুব বেশি মতভেদ নেই। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধ রোধ করা যে কোনও দায়িত্বশীল সরকারের কর্তব্য। তবে এই বিলের কিছু নির্দিষ্ট বিধান এবং তার সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে উপেক্ষা করা যায় না।
বিলটির সবচেয়ে আলোচিত দিক হল প্রতিরোধমূলক আটক বা প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন-এর ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গত সাত বছরের অপরাধের রেকর্ড খতিয়ে দেখে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার ক্ষমতা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। সরকারের যুক্তি— যারা বারবার অপরাধ করে জামিনে ছাড়া পেয়ে পুনরায় একই কাজে যুক্ত হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। বাস্তবিকই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে এমন ‘প্রি-এম্পটিভ’ বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ কিছু পরিস্থিতিতে কার্যকর হতে পারে।
তবে এখানেই মূল বিতর্ক। আইনের একটি মৌলিক নীতি হল— তা ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য হয়, অতীতের জন্য নয়। অতীতের অভিযোগ বা অপরাধের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিচার করে আটক করা হলে তা কি পরোক্ষে পুরনো অপরাধের জন্য নতুন শাস্তি দেওয়ার সমতুল নয়? এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, এই ধরনের ব্যবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিধি অনেকটাই বেড়ে যায়, যা যথাযথ নজরদারি ছাড়া অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
এই আশঙ্কা দূর করতে বিলে উপদেষ্টা পর্ষদ বা অ্যাডভাইসরি বোর্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে হাইকোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে আটক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয়। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— এই পর্ষদের কার্যকারিতা কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকবে, এবং তাদের সুপারিশ কতটা বাধ্যতামূলক হবে।
ইতিহাসের অভিজ্ঞতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। রাওলাট আইন, মিসা, টাডা বা পোটা— এই ধরনের আইনগুলি প্রাথমিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে আনা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অপপ্রয়োগ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, এই আইন ‘ভদ্রলোকদের’ জন্য নয়, বরং চিহ্নিত দুষ্কৃতীদের দমন করতেই এটি প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন কেবল উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে নয়, তার সম্ভাব্য প্রয়োগের ভিত্তিতেও বিচার্য।
অন্যদিকে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইতিমধ্যেই এ ধরনের গুন্ডাদমন আইন চালু রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র বা গুজরাতের অভিজ্ঞতা দেখায়, ‘গুন্ডা’ বা ‘অসামাজিক’ ব্যক্তির সংজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে কখনও কখনও সীমিত অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা ব্যক্তিকেও ‘অভ্যাসগত অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে— যা আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সব মিলিয়ে, এই নতুন আইন একটি দ্বিমুখী বাস্তবতার সামনে আমাদের দাঁড় করায়। একদিকে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দাবি। অন্যদিকে রয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমারেখা রক্ষার প্রশ্ন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অতএব, আইনটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে তার প্রয়োগের উপর। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিচারিক নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এই আইন সমাজের উপকারে আসতে পারে। অন্যথায়, এটি বিতর্ক ও অবিশ্বাসের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। গণতন্ত্রে শক্তিশালী আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন তার সুবিবেচিত ও সংযত প্রয়োগ।