শান্তিনিকেতনের বিদ্যুৎপ্রভা দেবী

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সৌমি মণ্ডল

রবীন্দ্রনাথ ১৩২২- এ লেখা ‘স্ত্রীশিক্ষা’ প্রবন্ধে বলছেন, ‘স্ত্রী হওয়া, মা হওয়া, মেয়েদের স্বভাব; দাসী হওয়া নয়। ভালোবাসার অংশ মেয়েদের স্বভাবে বেশি আছে— এ নহিলে সন্তান মানুষ হইত না, সংসার টিকিত না। স্নেহ আছে বলিয়াই মা সন্তানের সেবা করে, তার মধ্যে দায় নাই; প্রেম আছে বলিয়াই স্ত্রী স্বামীর সেবা করে, তার মধ্যে দায় নাই।’ এই সবটুকুই যেন বিদ্যুৎপ্রভা দেবীর জন্য লেখা। তাঁর সেবার আদর্শে তিনি শুধু শান্তিনিকেতনকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন এমন নয়, শান্তিনিকেতনের বাইরেও তাঁকে সেবিকা রূপেই আমরা দেখতে পাই।

১৮৯০ সালে ২ জুলাই হুগলি জেলার মহানাদ গ্রামে বিদ্যুৎপ্রভার জন্ম হয়। তাঁর পরিবার ছিল ভারতীয় খ্রিস্টান। পিতা বিপিনবিহারী পেশায় ছিলেন শিক্ষক। মাতা প্রিয়বালা দত্ত ছিলেন গৃহিণী। শৈশবেই বিদ্যুৎপ্রভা পিতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হন, বিদ্যানুশীলনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পিতার কাছেই বিদ্যুৎপ্রভার পাঠচর্চা শুরু হয়। ছোটবেলা থেকেই বিদ্যুৎপ্রভার মধ্যে দুটি ভাব সমান্তরালভাবে চলতে থাকে। একদিকে প্রকৃতি যেমন তাঁকে মুগ্ধ করত অন্যদিকে বাস্তব জগতের বিজ্ঞান তাঁর কাছে বিস্ময়ের মত ধরা দিত। এইভাবেই বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধানের জন্য ১০ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন সেন্ট মার্গারেট স্কুলে। সেখান থেকে রেকর্ড নম্বর পেয়ে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। সম্ভবত বিজ্ঞান- মনস্কতার জন্যই বিদ্যুৎপ্রভার মনে ডাক্তারি পড়ার বাসনা জাগে।


তাছাড়াও তিনি তৎকালীন গ্রামবাংলায় মহিলা চিকিৎসকের অভাব অনুভব করতে পারছিলেন। বিশেষ করে মেয়েদের পুরুষ ডাক্তারকে না দেখানোর জন্য চিকিৎসার অভাব তাঁকে ভীষণ ভাবিয়ে তুলেছিল। এখান থেকেই তিনি ঠিক করেন ডাক্তারি পড়বেন। সেইমত পিতাকে জানালেন তাঁর মনের কথা। খুব আনন্দের সঙ্গে পিতা তাঁকে লুধিয়ানায় LMF পড়তে পাঠিয়ে দেন। বাইরে পড়তে এসে বিদ্যুৎপ্রভা নিজের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর জগতে এসে পড়লেন। নিজেকে আরও চেনবার সুযোগ এল তাঁর। নিজের একাগ্রতা, বুদ্ধিমত্তা, পড়াশুনার মাধ্যমে লুধিয়ানার উইমেন্স ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজ-এ বিশেষ পরিচিতি তৈরি হল তাঁর। এখান থেকেও কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে তিনি পাটনায় একটি মিশনারী হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে যোগ দেন। উইমেন্স ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজ-এ পড়াকালীন তিনি শিশু প্রসূতি বিদ্যা সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখে ১০০ টাকা পুরস্কার পান।

বিদ্যুৎপ্রভার চিকিৎসক হওয়ার বাসনা থাকলেও তাঁর সুপ্ত ইচ্ছা ছিল তিনি সমাজের আরও বৃহত্তর ক্ষেত্রে কাজ করবেন। পাটনায় থাকার সময় বিদ্যুৎপ্রভা রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’ পড়েন। তাঁর মনে সমাজ বদলের ভাবনা আসে। এই ইচ্ছা চিন্তা থেকেই তিনি রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লেখেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শান্তিনিকেতনে এসে দেখা করতে বলেন। বিদ্যুৎপ্রভা দ্বিধায় পড়েন। একদিকে তাঁর বাবা-মায়ের স্বপ্ন ডাক্তার হয়ে হাসপাতালে চাকরি করা৷ অন্যদিকে, সমাজের গ্রামের মানুষের জন্য তাঁর নিঃস্বার্থ টান, তাদের সেবা করা। সব দ্বিধা কাটিয়ে বিদ্যুৎপ্রভা এক বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিনিকেতন আসেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। বিদ্যুৎপ্রভার সমাজসেবার প্রবল ইচ্ছার জয় হল। পাটনায় ফিরে গিয়ে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিলেন। স্বদেশী সমাজ পড়ে রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়নের ভাবনা তাঁর পছন্দ হয়েছিল। একপ্রকার সেই টানেই তিনি ফিরে এলেন শান্তিনিকেতন।

সালটা ১৯১৪ কি ১৯১৫ হবে। রবীন্দ্রনাথ কালীগ্রাম পতিসরকে কেন্দ্র করে দুই দফায় গ্রাম সংগঠনের কাজ শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে এই কাজে যোগ দিলেন বিদ্যুৎপ্রভা। তৎকালীন সময়ে বিদ্যুৎপ্রভাই একমাত্র মহিলা ছিলেন যিনি ছেলেদের সঙ্গে একযোগে গ্রামগঠনের কাজে যোগ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, শান্তিনিকেতনে তিনি তখন একমাত্র এবং প্রথম মহিলা চিকিৎসক। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যুৎপ্রভাকে শুধু চিকিৎসার দায়িত্ব দিলেন তাই নয় তিনি বিদ্যুৎপ্রভাকে গ্রামের পাঠশালায় পড়ানোর কাজে নিযুক্ত করলেন। এইসময় ১৩২২ বঙ্গাব্দের ১৩ অগ্রহায়ণ রবীন্দ্রনাথ বিদ্যুৎপ্রভাকে চিঠিতে লিখছেন, ‘মঙ্গল বুধবারের মধ্যেই তোমাদের সঙ্গে মেলবার আয়োজন করেছিলুম এমন সময় কেন যে প্ল্যান বদল হল অতুলের কাছে তার খবর পাবে। আমি চাই কিছুকাল ধরে ওখানে থেকে কাজের মধ্যে তোমাদের ভাল করে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে। এখন গেলে বড়জোর চারদিন মাত্র থাকতে পারতুম। তাতে কোনও কাজই হবে না, ওদিকে শান্তিনিকেতন আমাকে ডাক পাড়ছে, তাকে একেবারে অবহেলা করতে পারিনে। তোমাদের ওখানে কাজ করবার ক্ষেত্র প্রশস্ত, তেমনি কাজ করবার বিঘ্নও প্রশস্ত। এই উভয়ের যোগে তোমাদের সাধনা খুব কঠিন হবে। সাধনা সহজ না হওয়াই ভাল।

তাড়াতাড়ি সিদ্ধির মধ্যে পৌঁছনই আমাদের লক্ষ্য নয়। বস্তুত সাধনাই লক্ষ্য-দেশলাই জ্বলে চুরুট ধরাবার জন্যে। চুরুট ধরলেই সেটা ফেলে দিই, তারপরেও যদি সেটা জ্বলতে থাকে তবে তাকে মাড়িয়ে নিবিয়ে দিই কিন্তু বাতি জ্বলে আলো দেবার জন্যই। এই জন্যই তাকে নেবাবার জন্যই আলো জ্বালানো হয়না। আমাদের সাধনাই আমাদের জীবনের বাতি জ্বালিয়ে রাখে, কোনোরকম সিদ্ধির চুরুট ধরিয়ে তারপরে সে ধুলায় পড়ে দলিত হয় না। তোমাদের কাজের মধ্য দিয়ে তোমাদের জীবন উজ্জ্বল হতে থাক— তার থেকেই আমরা সকলের বড় আলোটি পাব, তোমাদের কাজের ফলের থেকে নয়। যাইহোক তুমি ঈশ্বরের প্রসাদ এবং আত্মপ্রসাদ এই দুই পাত্রের অমৃত পান করে বলী হও, আনন্দিত হও, অপরাজিত হও এই আশীর্বাদ করি।’

বিদ্যুৎপ্রভার জীবনে গুরুদেবের আশীর্বাদ ফলদায়ক হয়েছিল। তিনি ইশ্বরের প্রসাদ ও আত্মপ্রসাদ দুই লাভ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শ্রীনিকেতন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত করেন। ইংরেজি সাহিত্যে বিদ্যুৎপ্রভা ছিলেন অসাধারণ। শান্তিনিকেতনের অনুষ্ঠানে শেক্সপিয়রের মার্চেন্ট অফ ভেনিস-এ পোর্শিয়া-র ভূমিকায় অভিনয় করে সবার প্রশংসাভাজন হন। বিদ্যুৎপ্রভার ছিল সেবাগত প্রাণ। এন্ডরুজের এই জন্যই বিদ্যুৎপ্রভাকে পছন্দ হয় কিন্তু বিদ্যুৎপ্রভা এন্ডরুজের প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করেন। পরে অবশ্য তাঁর দলেরই বিশ্বেশ্বর বসু নামে এক ডাক্তারেরে সঙ্গে তিনি পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু নিয়তি হয়ত বিদ্যুৎপ্রভাকে অন্যভাবে দেখতে চাইছিল তাই বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়, তিনি শান্তিনিকেতন ত্যাগ করে গয়া শহরে চলে আসেন। সেখানেই তিনি শুরু করেন ডাক্তারি। তখন বিদ্যুৎপ্রভাই গয়ার একমাত্র মহিলা চিকিৎসক ও ধাত্রীবিদ্যায় পারদর্শী বলে খ্যাত। এভাবেই বিদ্যুৎপ্রভা ডাক্তারি ও সমাজসেবামূলক কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যান।

বিদ্যুৎপ্রভা যে শুধু ডাক্তারি বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন তা নয়, তিনি জানতেন উলের কাজ, ক্রুশের কাজ, কার্ড বোর্ডের কাজ। দরিদ্র মানুষদের জন্য তিনি নিজে হাতে শীতের পোশাক তৈরি করে দিতেন। দেশভাগের পর তিনি উদ্বাস্তু শিবিরগুলিতে রোগী সেবার কাজে মন দেন। ক্রমে সেখানে সরকারি ডাক্তার নিযুক্ত করা হয় তাঁকে। এইভাবেই তিনি বহু মহিলাকে শুধু ঘরের কাজে নয় বাইরের কাজেও অনুপ্রাণিত করতে থাকেন। কর্মই তাঁর জীবনের সব ছিল। কর্মেই ছিল তাঁর নিবেদিত প্রাণ। তাঁর শান্তিনিকেতনে আর ফেরা হয়নি, কিন্তু তিনি সমস্ত খবরই রাখতেন। রবীন্দ্রভবনচর্চার সদস্যা সাবিত্রী দে-র প্রবন্ধ থেকে জানতে পারি, সাবিত্রীদেবী যখনই বিদ্যুৎপ্রভার কাছে যেতেন তখনই তিনি শান্তিনিকেতনের কথা জিজ্ঞাসা করতেন। সাবিত্রীদেবীর কাছেই বিদ্যুৎপ্রভা রবীন্দ্রনাথের চিঠিগুলি অর্পণ করেন। ১৯৮৩ সালের ১৭ জানুয়ারি বিস্মৃতপ্রায় অন্তরালবর্তী এই মহীয়সী নারীর প্রয়াণ ঘটে।