নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অনীহা, গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক নেতানিয়াহুর রাজনীতি

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু নির্বাচন পরিচালনা করা নয়, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতাও। যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনে জয়ী হলে তাকে জনগণের রায় বলে স্বীকার করে, অথচ পরাজয়ের মুখে সেই রায়ের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তার গণতান্ত্রিক অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের মুখে পড়ে। ইজরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আচরণ সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ও তাঁর দল নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপ, আরব ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং ভোট কেনাবেচার মতো অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন। বিরোধীদের বক্তব্য, এটি নিছক নির্বাচনী অনিয়মের তদন্ত নয়, বরং নির্বাচনের ফলাফলকে রাজনৈতিকভাবে অবৈধ প্রমাণ করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল বলছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ১২০ আসনের মধ্যে পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। ফলে কোনও পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো আরব নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক দল— জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আমের সাফল্য। তারা সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে, যা তাদের সরকার গঠনের সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

এই ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। ইজরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের ইজরায়েলের প্যালেস্তাইনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। তাঁদের যুক্তি, যে রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাঁরা নিজেদের সমান নাগরিক হিসেবে বিবেচিত বোধ করেন না, সেই ব্যবস্থার নির্বাচনে অংশ নেওয়া আসলে বৈষম্যমূলক কাঠামোকেই স্বীকৃতি দেওয়া। কিন্তু এবারের নির্বাচনে পরিস্থিতি বদলেছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আকাঙ্ক্ষা তাঁদের অনেককে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।


এখানেই এবারের নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। গণতন্ত্রে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটের মূল্য সমান। ভোটার ইহুদি না আরব, সংখ্যাগরিষ্ঠ না সংখ্যালঘু, ধর্মীয় না ধর্মনিরপেক্ষ— এই পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর ভোটের বৈধতা বিচার করা যায় না। অথচ নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে আরব ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতিকে একটি জরুরি অবস্থা কিংবা ডানপন্থীদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা দেখা গেছে। এমনকি ভোটকেন্দ্রে আরব ভোটারদের উপস্থিতি নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি নিজের সমর্থকদের ভোট দিতে উৎসাহিত করেছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী কেন দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকারকে রাজনৈতিক বিপদ হিসেবে তুলে ধরবেন?

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর লিকুদ পার্টির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, আরব দলগুলিকে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের ঘুষ দেওয়া হয়েছে। কাতার ও তুরস্কের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শিন বেত বা ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, ইজরায়েলের কিছু রাজনীতিবিদ দোহাকে লক্ষ্য করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

বিদেশি অর্থের প্রভাব বা নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কোনও রাজনৈতিক দল কিংবা প্রার্থী আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু তদন্তের নামে একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং তাদের ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিপজ্জনক। শিন বেতও পরে স্পষ্ট করেছে, আইন মেনে ভোট দেওয়া কোনও সম্প্রদায়কে তদন্তের আওতায় আনার প্রশ্ন নেই। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক ডিন লিভনে জানিয়েছেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও পদ্ধতিগত বৈধতা নিয়ে যে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার কোনও ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের অভিযোগ, নেতানিয়াহু নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণ করার জন্য পরিকল্পিত ও সংগঠিত প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, বর্তমান সংসদীয় সমীকরণে আরব দলগুলির সমর্থন ছাড়া বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। আইজেনকোটের জোটের অধিকাংশ সদস্য অতীতে আরব দলগুলির সঙ্গে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু এবার ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাঁদের সেই অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।

এখানেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলের সম্ভাব্য উদ্দেশ্যটি বোঝা যায়। আরব দলগুলিকে যদি বিদেশি অর্থে প্রভাবিত, সন্দেহজনক কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে আইজেনকোটের পক্ষে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ বিরোধী জোটের সরকার গঠনের একমাত্র সম্ভাব্য পথটিকেই রাজনৈতিকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে এই অভিযোগগুলির উদ্দেশ্য।

জয়েন্ট লিস্টের শরিক বালাদ দলের নেতা সামি আবু শেহাদেহ এই পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, পরাজিত পক্ষ বর্ণবাদী উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করছে এবং নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার জন্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তাঁর এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইহুদি ও আরব নাগরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস এবং বৈষম্যের প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে সেই বিভাজন আরও তীব্র হলে তার প্রভাব শুধু সরকার গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বর্তমানে ইজরায়েলে সরকার গঠনের সামনে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে জাতীয় ঐক্য সরকার। দ্বিতীয়ত, আইজেনকোটের জোট থেকে কয়েকজন সদস্যকে ভাঙিয়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ডানপন্থী সরকার গঠন। তৃতীয়ত, আরব দলগুলির সমর্থনে আইজেনকোটের নেতৃত্বে একটি সংখ্যালঘু সরকার। শেষের সম্ভাবনাটিই বিরোধীদের কাছে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তাৎক্ষণিক জনমত সমীক্ষাতেও বিরোধী জোটের ভোটারদের মধ্যে এই বিকল্পটির প্রতি বেশি সমর্থন দেখা গেছে।

তবে প্রশ্ন হলো, আইজেনকোট কি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও জোটের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা অতিক্রম করে আরব দলগুলির সহযোগিতা নিতে পারবেন? আরব নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকার গঠনের আলোচনা করা কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমঝোতা করাই রাজনৈতিক বাস্তবতা। অথচ ইজরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলির অংশগ্রহণকে এখনও অনেকেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নন।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, সংখ্যালঘুর অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাও। নির্বাচনে পরাজিত হওয়া কোনও অপরাধ নয়, যেমন নির্বাচনে জয়ী হওয়া কোনও দলের চিরস্থায়ী অধিকার নয়। আরব নাগরিকেরা ভোট দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক মতামত জানিয়েছেন। তাঁদের ভোটে যদি কোনও দলের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তবে সেটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

নেতানিয়াহুর সামনে এখন দুটি পথ। তিনি চাইলে নির্বাচনের রায় মেনে নিয়ে বিরোধীদের সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন, অথবা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিভাজনকে আরও উসকে দিয়ে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু দ্বিতীয় পথটি ইজরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করবে। কারণ নির্বাচনে পরাজয় সাময়িক, কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরাজয় একটি দেশের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করে। ইজরায়েলের সামনে এখন সেই কঠিন পরীক্ষাই উপস্থিত।