সরকারি কাজে বাংলা বাধ্যতামূলক

Image: IANS

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তকে নিছক একটি ভাষানীতি হিসেবে দেখলে তার গুরুত্ব অনেকটাই খর্ব করা হয়। প্রশাসনের ভাষা আসলে নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগের ভাষা। সেই যোগাযোগ যত সহজ, স্বচ্ছ ও বোধগম্য হয়, প্রশাসনও তত বেশি জনমুখী হয়ে ওঠে। তাই পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।

দীর্ঘদিন ধরে এমন এক বাস্তবতা দেখা গেছে, যেখানে রাজ্যের সাধারণ মানুষ নিজের দৈনন্দিন জীবনে যে ভাষায় কথা বলেন, সরকারি দপ্তরে গিয়ে অনেক সময় সেই ভাষায় পরিষেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা পান না। সরকারি চিঠি, নোটিস, আবেদনপত্র, আদেশনামা কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক নির্দেশ যদি এমন ভাষায় লেখা হয় যা নাগরিকের কাছে দুর্বোধ্য, তবে প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। গণতন্ত্রে এই দূরত্ব কাম্য নয়। রাষ্ট্রের ভাষা নাগরিকের কাছে যত বেশি সহজবোধ্য হবে, সরকারি পরিষেবা তত বেশি কার্যকর হবে।

এই কারণেই সরকারি কাজে বাংলার ব্যবহারকে কেবল ভাষার মর্যাদার প্রশ্ন না করে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবেও দেখা দরকার। যে কৃষক সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিতে চান, যে শ্রমিক কোনও সরকারি পরিষেবা সম্পর্কে জানতে চান, যে বৃদ্ধ ভাতা বা পেনশনের জন্য আবেদন করেন কিংবা যে সাধারণ মানুষ থানায় অভিযোগ জানাতে যান—তাঁদের প্রত্যেকেরই অধিকার রয়েছে এমন ভাষায় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার, যে ভাষা তাঁরা স্বচ্ছন্দে বোঝেন। বাংলা সেই কাজটি করতে পারে।

তবে সরকারি কাজে বাংলা চালু করার অর্থ ইংরেজি বা অন্য ভাষাকে অস্বীকার করা নয়। বরং বাস্তব প্রশাসনে প্রয়োজনীয় বহুভাষিক দক্ষতার সঙ্গে বাংলাকে প্রধান প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই যুক্তিযুক্ত। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মতো বহুভাষিক রাজ্যে এই ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি। বিজ্ঞপ্তিতে হিন্দি, নেপালি, সাঁওতালি, রাজবংশী, কামতাপুরী, কুরমালি প্রভৃতি ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা এই নীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। বাংলা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অন্য মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা— দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়।


তবে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়, তার বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা। সরকারি দপ্তরে বাংলা ভাষায় দক্ষ কর্মীর অভাব থাকলে, বাংলা টাইপিং ও সফ্‌টওয়্যার ব্যবহারে সমস্যা থাকলে, অথবা সরকারি পরিভাষার মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে উদ্যোগটি কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। তাই অনুবাদক ও ভাষা-বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, বাংলা-বান্ধব তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং অভিন্ন সরকারি পরিভাষা তৈরির পরিকল্পনাগুলিকে দ্রুত কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে অনুবাদের মানও হতে হবে নির্ভুল ও সহজবোধ্য। দুর্বোধ্য বাংলা দিয়ে ইংরেজির জায়গা পূরণ করলে উদ্দেশ্য সফল হবে না।

সরকারি কাজে বাংলা ব্যবহারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রশাসনের স্বচ্ছতা। নাগরিক যখন সরকারি সিদ্ধান্ত, অধিকার, নিয়ম এবং পরিষেবার শর্ত নিজের ভাষায় বুঝতে পারেন, তখন তথ্যের ওপর তাঁর অধিকার শক্তিশালী হয়। প্রশাসনিক জবাবদিহিও বাড়ে। অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও বাংলা বাধ্যতামূলক করা তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। থানায় বা অন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে ভাষার কারণে কোনও নাগরিক যেন অসুবিধায় না পড়েন, সেটিই হওয়া উচিত এই নীতির অন্যতম লক্ষ্য।

বাংলা ভাষা পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এটি এই রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনযাপনের ভাষা। সেই ভাষাকে প্রশাসনের ভাষা করে তোলা মানে প্রশাসনকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসা। ফলে এই উদ্যোগকে ভাষিক আবেগের সংকীর্ণ পরিসরে না রেখে গণতান্ত্রিক জনপরিষেবার সংস্কারের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

সরকারি দপ্তরে বাংলা যেন শুধু অনুবাদের ভাষা না হয়, বরং নাগরিকের সঙ্গে প্রশাসনের স্বাভাবিক যোগাযোগের ভাষা হয়ে ওঠে— এটাই এখন প্রত্যাশা। আর সেই সঙ্গে বাংলার পাশে রাজ্যের অন্যান্য মাতৃভাষাকেও যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে একটি বহুভাষিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য।