অমিতাভ মুখোপাধ্যায়: সাম্প্রতিক খবরে প্রকাশ যে বাংলাদেশ সরকারিভাবেই তিস্তা নদী এবং তার অববাহিকার উন্নয়ন কার্যের জন্য চিনের কাছ থেকে আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তা প্রার্থনা করেছে। ব্যাপারটা ভারতের পক্ষে উদ্বেগের কারণ বাংলাদেশের অন্তর্গত এই তিস্তা প্রকল্পের খুব কাছেই রয়েছে ভারতের শিলিগুড়ি করিডর যা হল উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগের একমাত্র পথ।
ব্যাপারটা কিন্তু খুব নতুন কিছু নয়। সেই ২০১৬ সালেই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিনকে অনুরোধ করেছিলেন তিস্তা নদী প্রকল্প উন্নয়ন সংক্রান্ত ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে এবং পাওয়ার চায়না নামে চিনের এক সংস্থা তখন একটি প্রজেক্ট রিপোর্ট দাখিল করেছিল যদিও সেই রিপোর্ট বাংলাদেশের মধ্যেই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।এর পর দীর্ঘদিন এই বিষয়ে আর কোনও সাড়াশব্দ শোনা যায়নি।শেখ হাসিনার চিনের দ্বারস্থ হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল তিস্তা জলবণ্টন ফর্মূলার ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র আপত্তি।
এখন দেখে নেওয়া যাক তিস্তা জলবণ্টন সমস্যাটি ঠিক কী , এ ব্যাপারে বাংলাদেশের দাবির যৌক্তিকতাই বা কতটুকু এবং এই সমস্যার সমাধানই বা কোন পথে।তিস্তা নদীর উৎপত্তি সিকিমের তিস্তা খাঙ্গসে হিমবাহের পাদদেশে অবস্থিত ছোম্বু ছু হ্রদ থেকে। সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর তিস্তা বাংলাদেশের রংপুর দিয়ে ওই দেশে ঢুকেছে। এরপর মিলিত হয়েছে যমুনা নদীর সঙ্গে। বাংলাদেশের আরও কয়েকটি নদী এই যৌথ ধারার সঙ্গে মিলিত হবার পর তা গিয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে।
সুতরাং তিস্তা হল একটি আন্তর্জাতিক নদী এবং এর জলবণ্টন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই এগোতে হবে। কিন্তু পূর্বতন মনমোহন সিং সরকার এ বিষয়ে যে ভাবে এগোতে চেয়েছিল তা বাস্তবসম্মত বা তথ্যভিত্তিক কোনোটাই না। মনে রাখতে হবে যে উত্তরবঙ্গে ভারতের অন্তর্গত তিস্তা নদী প্রকল্পে বিরাট অর্থ ব্যয় করা হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই নদী প্রকল্পের উপর নির্ভরশীল। এইখানেই ছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তি এবং তা খুবই যুক্তিসংগত।
এক হিমবাহের পাদদেশে অবস্থিত হ্রদ থেকে নির্গত হলেও তিস্তা হল মূলতঃ বর্ষাস্নাত এবং বর্ষানির্ভর নদী বিশেষতঃ উত্তর বাংলায় এবং বাংলাদেশে। এই নদীটির বার্ষিক গড়পরতা জলপ্রবাহ ৬০ বিলিয়ন কিউসেক মিটার। সমস্যাটা তৈরি হয় শুখা মরশুমে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে এপ্রিল, এই সময়টাতে যখন গড়পরতা জলপ্রবাহ এসে দাঁড়ায় মাত্র ৬ বিলিয়ন কিউসেক মিটারে। পূর্বতন মনমোহন সিং সরকারকে সমালোচনার জায়গাটা হল এইখানে। বাংলাদেশের সঙ্গে সইসাবুদের জন্য তাঁরা একটি খসড়া চুক্তিপত্র প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন যার দ্বারা শুখা মরশুমে ৫০:৫০ ভিত্তিতে তিস্তার জল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্টিত হত। এই ব্যবস্থা হয়ে দাড়াত অযৌক্তিক। কেন, সে কথায় আমরা এবারে আসব।
প্রথমতঃ এ ক্ষেত্রে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা যে অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বর্ষার জল এসে নদীকে সমৃদ্ধ্ব করে তা খুব গুরূত্বপূর্ণ। তিস্তায় ভারতের ক্যাচমেন্ট এরিয়া হল ১০,১৫৫ বর্গ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশের মাত্র ২০০৪ বর্গ কিলমিটার। অর্থাৎ বাংলাদেশের ভাগ হল সমগ্রের মাত্র ১৭ শতাংশ। অংকের হিসেবই বলে দিচ্ছে যে ভারতের দিক থেকে প্রবাহিত যে জল তিস্তাকে সমৃদ্ধ করে তার পরিমাণ বাংলাদেশের দিক থেকে আসা জলের চাইতে অনেক বেশী।
দ্বিতীয়তঃ পুরো ব্যাপারটাতেই বাংলাদেশের দিক থেকে একটা অযথা প্রতিযোগিতায় নামার ঈঙ্গিত দেখা যায়। উত্তরবঙ্গে অবস্থিত ভারতের গাজলডোবা প্রকল্পের প্রত্যুত্তরে বাংলাদেশ তাদের নীলফামারি জেলার ডালিয়াতে এক ব্যারাজ নির্মাণ করেছে সেচকার্যের উদ্দেশে। ডালিয়া প্রকল্প থেকে তাঁরা ৫,৪০,০০০ হেক্টর জমিতে কৃষিকাজের জন্য জল সরবরাহ করতে চায়।এ ব্যাপারে ভারতের লক্ষ্য হল ৯,২২,০০০ হেক্টর। কাজেই বাংলাদেশ কিভাবে গাজলডোবা থেকে ৫০:৫০ ভিত্তিতে জল দাবি করতে পারে?
ভারত-বাংলাদেশ যুক্ত নদী কমিশনের অকার্যকারিতার ফলে এই জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দু দেশের কোন যৌথ ভাবনা নেই। বাংলাদেশ তাঁর দিকে তিস্তা অববাহিকা অঞ্চলের ৬৩ শতাংশ জমিকে সেচ কার্যের আওতায় এনেছে। অথচ দেশের অন্যান্য অংশে এর গড় পরিমাণ মাত্র ৪২ শতাংশ। ব্যাপকভাবে উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশ অন্তর্গত তিস্তা অববাহিকায় ফলনের ঘনত্ব ২০০ শতাংশ অথচ ভারতের অংশে এর পরিমাণ ১৬৯ শতাংশ। কাজেই এক অপরিকল্পিত কৃষিব্যবস্থার জন্য বাংলাদেশের সত্যিই শুখা মরশুমে জল দরকার। কিন্তু সেই জল পাওয়া যাবে কোথায়?
সমাধানের জন্য তারেক রহমানের সরকার যে দিকে পা বাড়াচ্ছে তা ভারতের জন্য বিপজ্জনক এবং বাংলাদেশের জন্য অকার্যকর।এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে চীনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন প্রথমে হাসিনা ওয়াজেদই এবং পাওয়ার চায়নার দাখিল করা প্রোজেক্ট রিপোর্ট তাঁর সরকার সম্পূর্ণ গোপন রাখতে চেষ্টা করেছিল। তা সফল হয়নি কারণ এই চীনা সংস্থাই ইউ টিউব মারফত তা প্রচার করে। এ ছাড়া আরও বিভিন্ন সূত্র মারফতও তা বাইরে এসেছে।
বাংলাদেশে তিস্তা নদী সাধারণভাবে তিন কিলোমিটার চওড়া। পাওয়ার চায়নার প্রোজেক্ট রিপোর্ট বলছে যে এই প্রসার চারভাগের তিনভাগ কমিয়ে দেওয়া হবে । এর ফলে পাওয়্যা যাবে ১৭১ বর্গ কিলোমিটার জমি।এই জমি ব্যবহার করা হবে নগরায়ন, কৃষি এবং নতুন উপনিবেশ গড়ে তোলার জন্য। ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা বাড়ান হবে দর্তমানের ৫ মিটার থেকে ১০ মিটারে এবং নতুন জেটি, বন্দর ইত্যাদি গড়ে তলা হবে।
কিন্তু মুশকিল হল তিস্তা নদী দিয়ে গড়ে ৫০ মিলিয়ন টন পলি প্রবাহিত হয় এবং নদীর প্রসার কমে যাওয়ার ফলে এই পলি নদীখাতে জমতে থাকবে। জলপ্রবাহের বেগ থাকবে একই। ফলে ভাঙতে থাকবে নদীর পাড় এবং তা নদীখাতের গভীরতা দেবে আরো কমিয়ে। ফলে বর্ষার মরশুমে নদীর কূল ছাপিয়ে তিস্তা্র জল বিস্তীর্ণ এলাকাকে করবে প্লাবিত।
বর্তমানে তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে চীনের যে আলোচনা চলছে তাতে এই ইঙ্গিতই আসছে যে পাওয়ার চায়নাই এই প্রকল্পে থাকবে। তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট আসার কথা কয়েক মাস পরে।
তবে তা যে পুর্বতন রিপোর্টের চাইতে খুব একটা আলাদা কিছু হবে না তা বলাই বাহুল্য।এই সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান আছে । তবে তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে ভারত এবং বাংলাদেশ দু পক্ষকেই।রংপুর ডিভিশনকে বলা হয় বাংলাদেশের চালের ভান্ডার। কিন্তু এখানে চাষ হয় মূলতঃ আমন( জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) এবং বোরো ( নভেম্বর থেকে মে) ধানের।
আমন চাষ বৃষ্টিধারা পায় প্রধানতঃ জুলাইয়ের শেষ থেকে এবং অক্টোবর মাসেই তা শেষ হয়ে যায় কারণ এই সময়ই মৌসুমী বায়ু ভারত-বাংলাদেশের এই অঞ্চল থেকে বিদায় নিয়ে থাকে। কাজেই যা দাড়াচ্ছে তা হল বাংলাদেশের এই উত্তরাঞ্চলের আমন চাষের একটা বড় অংশ এবং বোরো চাষের পুরোটাই শুখা মরশুমে পড়ছে। এই জন্যই বাংলাদেশ তিস্তার জল পাওয়া নিয়ে এত হৈ হট্টগোল করছে। কিন্তু জল পাওয়া যাবে কোথায়? এর একটা সমাধান হতে পারে যদি বাংলাদেশ তাঁর উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে শস্য চাষের ধরণটা বদলায়।ভারত এবং বাংলাদেশ দু পক্ষকেই সেই রকম শস্য চাষের দিকে ঝুঁকতে হবে যাতে জল লাগে কম এবং যা শুকনো আবহাওয়াতেও টিকে থাকতে পারে।