অনুপ্রবেশ সমস্যা

ফাইল চিত্র

পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ করে শহর কলকাতা এখন জঙ্গিদের নিরাপদ বাসস্থান। সেই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের ওপর চরম অত্যাচার ও নিপীড়নের জন্য বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারদেরও সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন চরম বিড়াম্বনার মধ্যে পড়ে গেছে। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্ব কালে অনুপ্রবেশের সংখ্যা বেশ কিছুটা কমেছিল। এখন সংখ্যালঘু হিন্দুরা অত্যাচারিত এবং সর্বস্ব হারিয়ে সীমান্তে এসে জড়ো হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার জন্য। সীমান্তের অনেক অঞ্চলেই অনুপ্রবেশকারীদের ঢুকতে দিচ্ছে না বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। কিন্তু বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত অতি দীর্ঘ এবং পুরো সীমান্ত কাঁটাতারের বেড়া নেই অনুপ্রবেশ ঢেকাতে। ফলে এই উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে অবলীলায় যেমন জঙ্গিরা ঢুকছে, তেমনই সংখ্যালঘু হিন্দুরাও ঢুকছে— তাঁদের ঢুকতে বাধা দেওয়ার কেউ নেই।

তাই বাংলাদেশের তদারকি সরকারের জমানায় অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে জঙ্গিদের এই রাজ্যে প্রবেশ। ফলে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের কাছে এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে এই অনুপ্রবেশ সমস্যা— তেমনি জঙ্গিদের ঢোকাও গুরুতর সমস্যা।
জঙ্গিদের সীমান্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে তারপর কলকাতায় এসে ঘাঁটি গাড়া এবং এখান থেকেই নাশকতার ছক আঁকা। জঙ্গিদের সঙ্গে ভারতের বাইরের দেশের জঙ্গিদের বিশেষ করে পাকিস্তানের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র পাচ্ছে কলকাতায় লুকিয়ে থাকা জঙ্গিরা। ইদানিং বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ— তাদের কাছ থেকে নাশকতামূলক কাজ কীভাবে করা হবে, তার ছক আঁকা কাগজপত্র পাওয়া গেছে। কলকাতায় ঘাঁটি গেড়ে তারা পাক জঙ্গিদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। কাশ্মীরের একজন জঙ্গিও কলকাতা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনার আমলে যেসব জঙ্গিদের জেলে পুড়েছিল, সারা দেশে অভিযান চালিয়ে তাদের প্রায় সবাইকে ছেড়ে দিয়েছে। তাদের একটা বড় দল সীমান্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেছে। এদের অনেকেই ফাঁসির আবার অনেকের আজীবন কারাবাস হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের বদান্যতা? তারা এখন মুক্ত।

বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দীর্ঘ। সীমান্তের জেলাগুলি— যেমন নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং কোচবিহারে প্রচুর সংখ্যায় বাংলাদেশী নাগরিক ইদানিং ঢুকে পড়েছে ওই দেশে অত্যাচারিত হয়ে। মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গি, রানিনগর এবং ভগবানগোলা— এইসব অঞ্চলের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই। সুতরাং এইসব অঞ্চলের অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে যেমন ঢুকছে অনুপ্রবেশকারীরা, তেমনই ঢুকছে জঙ্গিরা। প্রায় ৯৩ কি এলাকায় কোনও বেড়া নেই। সুতরাং জঙ্গিদের ঢুকতে কোনও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। পুরো সীমান্ত কাঁটা তারের বেড়া দেওয়া হয়নি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে। এই প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার জমির ব্যবস্থা না করার জন্য এই বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জমির অভাব নেই, কেন্দ্রীয় সরকারই কোনও চেষ্টা করেনি এই বেড়া দেওয়ার। এই উন্মুক্ত অঞ্চল দিয়েই জঙ্গিরা ঢুকে যাচ্ছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশ সমস্যার সমাধান কেন্দ্রের দায়দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বিএসএফের দায়িত্ব অনুপ্রবেশ রোধ করা। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অভিযোগ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ন্দ্রেতার দায়িত্ব পালন করছে না। তেমনই অভিযোগ জঙ্গিদের বেলাতেও।


কলকাতা পুলিশকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এই বিরাট জনবহুল শহরে জঙ্গিরা কোথায় কীভাবে লুকয়ে নাশকতার ছক কষছে, তার খোঁজ পাওয়া কঠিন। তবুও কলকাতা পুলিশ এ ব্যাপারে সক্রিয়। এবং কয়েকজন জঙ্গি তাদের হাতে ধরাও পড়েছে। তবে যেটা বিশেষ প্রয়োজন, তা হল গোয়েন্দা পুলিশকে আরও দক্ষ হতে হবে। কারণ জঙ্গিদের আত্মগোপন করে থাকা— এবং তাদের সন্ধান দেওয়া গোয়েন্দা পুলিশেরই কাজ। এই কাজে তাদের দক্ষতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে সীমান্তে বিএসএফের নজরদরি আরও জোরদার হতে হবে। সীমান্তে দালালরাও সক্রিয় বাংলাদেশের বর্তমান অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির কারণে। এই দালালরা টাকার বিনিময়ে অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্তের জেলাগুলিতে ঢুকতে দিচ্ছে। তারা বিএসএফের নজর এড়িয়ে চলে আসছে।

এরপর বাংলাদেশে ভবিষ্যতে নির্বাচন হলে যে সরকার গঠিত হবে, সে সরকারও অনুপ্রবেশ সমস্যার সমাধানে আগ্রহী হবে বলে মনে হয় না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূস খান বলেছেন, সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ না করে নির্বাচন করা হবে না। অর্থাৎ তাঁর কথায়, ২০২৫ সালে অথবা ২০২৬ সালের গোড়ার দিকে নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ বন্ধ করা হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এই সময় অনুপ্রবেশ সমস্যা আরও বাড়বে। বাড়বে জঙ্গিদের পশ্চিমবঙ্গে ঢোকাও।

বাংলাদেশে যেভাবে পাকিস্তান প্রভাব বিস্তার করেছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত সরকার। ইতিমধ্যেই দু’টি জাহাজ করাচি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ঢুকেছে। তাতে বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রও রয়েছে বলে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ যখন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছিল, তকন অনুপ্রবেশ সমস্যা তীব্রতর হয়েছিল। বিএসএফের জওয়ানদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের জওয়ানদের গুলি বিনিময় প্রায়ই হত। তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হত যেমন কেন্দ্রীয় সরকারকে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গকেও। বাংলাদেশ যদি একটি ইসলামিক রাষ্ট্র হয়, তাহলে অনুপ্রবেশ আবার প্রবল হবে। কারণ সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ তখন আরও বাড়বে।