হীরক কর
ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয় যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়, তখন প্রতিবেশীর পরিচয় রাজনীতি নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে জামায়াতের উত্থানে দিল্লির অস্বস্তি আসলে ইসলামিক রাজনীতির নয়, নিজের নৈতিক অবস্থান হারানোর ভয়?
এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ওপাড়ে মৌলবাদ! নিজের ঘরে হিন্দু রাষ্ট্র চাই, প্রতিবেশীর ঘরে ইসলামিক হুমকি ? জাতীয়তাবাদ এখানে যদি নৈতিক, তবে ওখানে কেন বিপজ্জনক? রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাংস্কৃতিক আধিপত্য এখানে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, ওখানে হলেই কেন মৌলবাদ? এই প্রশ্নগুলো একটাও আমার প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রশ্ন। ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছে, কিন্তু প্রতিবেশী দেশে একই ধরনের পরিচয় রাজনীতি উঠলেই দিল্লী তাকে নিরাপত্তা-হুমকি বলে চিহ্নিত করছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটা আসলে ‘পলিসি কন্ট্রাডিকশন’। আবার এটাও ঠিক যে, এটা রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভের স্বাভাবিক পরিণতিও এটা। যে রাষ্ট্র নিজের ভিতরে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে, সেই রাষ্ট্রের প্রতিবেশীর আইডেনটিটি পলিটিক্স নিয়ে নৈতিক উদ্বেগ দেখানো কতদূর সঙ্গত, এবং এর ফলে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক উচ্চতা ক্ষয়ে যাচ্ছে কি না, সেটাই মূল ভাবার বিষয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে। এবার বাংলাদেশে ভোটের ময়দানের আরও বিশেষত্ব, এই প্রথমবার জামাত আর বিএনপি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে নির্বাচনে লড়ছে। এর আগে জামাত ছিল বিএনপির ভোটসঙ্গী। ইতিমধ্যে আমেরিকার কয়েকটি মিডিয়া দাবি করেছে, ৩০০ আসনের বাংলাদেশ সংসদে একক ভাবে দেড়শোর বেশি আসনে জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও ডক্টর শফিকুর রহমানের জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন এগারো দলের জোট সরকারের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা ক্রমে উজ্জ্বল হচ্ছে। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর যেদিন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণে গোটা বাংলাদেশ শোকে ডুবে গেছিল। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলতে শুরু করেছিলেন, খালেদা-পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে অন্তত দুইশো আসন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে চলেছে। কিন্তু প্রচার তীব্রতর হতেই হাওয়া ঘুরতে শুরু করে জামায়াতে ইসলামীর দিকে। জামাতের প্রতিটি জনসভা, মিছিলে মানুষের উপচে পড়া ভিড় তারই সংকেত। শফিকুর রহমানও নিজেকে এমন ভাবে প্রচারে মেলে ধরেছেন যে, একমাত্র তিনিই বাংলাদেশকে দিতে পারেন নির্ভরযোগ্য, স্থায়ী একটা নির্বাচিত সরকার।
জামায়াতের মতো উগ্র জাতীয়তাবাদী পার্টি ঢাকার মসনদে বসা মানেই ভারতের ‘কমফোর্ট জোন’ ভেঙে পড়া। বারো বছর আগে নরেন্দ্র মোদি ভারতবাসীকে আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। মানুষ সে কথা বিশ্বাস করেছিল। অনেকটা সেই টোনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ৬৭ বছরের জামায়াত প্রধান। ভারতের আসল ভয়টা কিন্তু স্রেফ মৌলবাদ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হারিয়ে ফেলা। সৌদি আরবের কট্টর ইসলামিক শাসনের সঙ্গে যদি মোদি সরকারের ‘মধুচন্দ্রিমা’ চলতে পারে, তবে বাংলাদেশে আপত্তি কেন? অতএব প্রশ্নটা সেখানে নয়। উত্তর লুকিয়ে আছে সার্বভৌমত্বের সমীকরণে। দিল্লী জানত, হাসিনাকে ফোন করলে ওপার থেকে সাড়া মিলবে। শফিকুর রহমানের জামায়াতের ক্ষেত্রে সেই নিশ্চয়তা নেই। আসলে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিপরীতে বাংলাদেশে ইসলামিক পরিচয়ের রাজনীতি আজ এক ধরনের ‘মিরর-এফেক্ট’, প্রতিবিম্বিত প্রতিফলন।
বাংলাদেশিদের মনের বার্তাটি সরল—ওপারে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ চললে এপারেই বা কেন নয় ? সত্য এই যে, এই কূটনৈতিক ও নৈতিক বৈপরীত্যের রাজনীতি কখনও চুপিসারে কাজ করে না, বরং সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে নৈতিক বলে দাবি করে। গত এগারো বছরে ভারতে ঠিক এই আত্মবিশ্বাসী দ্বিচারিতারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখা যাচ্ছে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু নাগরিক অধিকার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দিল্লী যখন বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তখন প্রশ্নটা কেবল কূটনৈতিক নয়— গভীরভাবে নৈতিক। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয় রাজনীতি যদি এ দেশের ‘স্বাভাবিক পরিণতি’ হতে পারে, তা হলে একই বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশেও পারে। এ দেশে আজ যেমন নেহরুকে ‘তুষ্টিকরণের জনক’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে এবং নেহরুবাদকে দেশের বিপদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।একই জিনিস আগামী দশ বছর পরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হতে পারে। মুজিবর রহমানকে ইসলামের শত্রু এবং ‘যত নষ্টের গোড়া’ আখ্যা দেওয়া হতেই পারে।
ভারতে যেমন গত দশ-বারো বছর ধরে তিল তিল করে রাষ্ট্রীয় শাসকেরা সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, বাংলাদেশে জামায়াত সেটাই করতে পারে। এখানে যেমন উচ্চগ্রামে সংখ্যালঘু নাগরিক অধিকারের কাঠামোগত সংকোচন ঘটেছে, বা ঘটানো হয়েছে। আগামী দিনে সে ভাবে বাংলাদেশেও হয়তো হিন্দু এবং খ্রিস্টানদের আইনের জালে নানা ভাবে ছাঁকা হতে পারে। হয়তো জামায়েতের শাসনে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের আখ্যান সামনে এনে একরৈখিক আধিপত্যবাদ, যেখানে উগ্র জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা হিসেবে প্যাকেটবন্দি করে, আর অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ব্যবহার করা হতে পারে প্রয়োজনমতো লাঠি হিসেবে।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে জাতীয়তাবাদ আর কেবল ভূখণ্ড বা সংবিধাননির্ভর নয়। তা ক্রমশ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে গেছে। হিন্দুত্ব এখন শুধুই একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়— এটি প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় প্রতীক, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় মিছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির প্রকাশ্য উদযাপন। সব মিলিয়ে হিন্দু পরিচয় আজ রাষ্ট্রীয় ছাতার তলায় নিরাপদ, উৎসাহিত এবং প্রায়শই পুরস্কৃত। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ বা গুজরাটের মতো বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে কোনও বাস্তব বাধা নেই। রামনবমীর মিছিল হোক বা কাঁওড় যাত্রা— রাস্তা বন্ধ হয়, পুলিশ পাহারা দেয়, প্রশাসন সহযোগিতা করে। কিন্তু একই জায়গায় সংখ্যালঘুরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে গেলেই সংবিধান সামনে এনে বলা হয় ‘এটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, প্রকাশ্যে ধর্মের প্রদর্শন ঠিক নয়।’
গত ক্রিসমাসে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী নানা সংগঠন কী ভাবে খ্রিস্টানদের হেনস্থা করেছিল, নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো সংবাদপত্রে পর্যন্ত সে খবর প্রকাশিত হয়। আমাদের দেশে নাগরিকত্ব থেকে শুরু করে বাসস্থান, ধর্মীয় স্বাধীনতা থেকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য তৈরি হয়েছে। নিশিকান্ত দুবে, যোগী আদিত্যনাথদের মতো নেতারা প্রকাশ্যে বলে দিচ্ছেন,- ভারত মূলত হিন্দুদের দেশ, মুসলিম শাসকরা আক্রমণ না করলে দেশটা হিন্দুদেরই থাকত।
আমরা এখানে উগ্র জাতীয়বাদের রাস্তায় হাঁটলে সেটা দেশপ্রেম, সংস্কৃতি আর সভ্যতার পুনরুত্থান। আর বাংলাদেশের মানুষ যদি জামায়াতকে সমর্থন করে, তাহলে সেটা চরমপন্থা, মৌলবাদ আর আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি! বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতার কাছাকাছি আসতে পারে। এই সম্ভাবনাতেই নয়াদিল্লীর উদ্বেগ তীব্র। কিন্তু বুঝতে হবে, ভারতে গৈরিক রাজনীতির উত্থান যেমন কোনও শূন্যতা থেকে জন্ম নেয়নি, বরং তা দীর্ঘ বছরের পরিবারতান্ত্রিক, কিছুটা দুর্নীতিগ্রস্ত ও কিছুটা সংখ্যালঘু-কেন্দ্রিক শাসনের এক অনিবার্য পরিণাম। ঠিক তেমনই বাংলাদেশে জামায়াতের উত্থানও কোনও শূন্যতায় হয়নি। এটি এক ধরনের আইডেনটিটি পলিটিক্সের প্রতিক্রিয়া। যার অনুপ্রেরণা এসেছে আঞ্চলিক বাস্তবতা থেকেই। ভারতে গত এক দশকে যেভাবে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাষ্ট্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে, তার প্রতিধ্বনি প্রতিবেশী সমাজেও পড়েছে। পরিচয় যখন রাষ্ট্রের হাতিয়ার হয়, তখন প্রতিবেশীর রাজনীতিও সেই ভাষায় কথা বলতে শেখে।
প্রতিবেশীর আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি না দেখতে চাওয়াই এখানে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্বস্তি। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, ভারতে যদি হিন্দুত্ব রাষ্ট্রীয় ভাষ্য হতে পারে, তবে বাংলাদেশে ইসলামিক পরিচয়ের রাজনৈতিক উত্থানকে কেবল ‘উগ্রতা’ বলে দাগিয়ে দেওয়া কি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ ? দিল্লীর ভয় আদতে ইসলামিক রাষ্ট্র নয়। দিল্লীর ভয় হলো— এমন এক ঢাকা, যাকে আর ফোন করে ‘ম্যানেজ’ করা যাবে না। শেখ হাসিনার আমলে যে রাজনৈতিক নিশ্চয়তা ছিল।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দিল্লীর কথা ভাবা হবে। সেই নিশ্চয়তা জামায়াত বা অন্য কোনও নতুন শক্তির আমলে থাকবে না। এই অনিশ্চয়তাই ভারতের আসল কূটনৈতিক আতঙ্ক। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিক উচ্চতা কোনও চিরস্থায়ী সম্পদ নয়। ইতিহাস একটা জিনিস বারবার প্রমাণ করেছে, যে দেশ নিজের ভিতরে বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তোলে, সে দেশ প্রতিবেশীর রাজনীতি নিয়েও নৈতিক উচ্চতা হারায়। এখানে হলে ভালো, ওখানে হলেই দোষ; এই যুক্তিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি টেকে না। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নীতি হলে, ওখানে সেটাই মৌলবাদ; এই যুক্তিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও টেকে না। শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশীর ভোটবাক্সেও নিজের রাজনীতির প্রতিবিম্বই ফিরে আসে।