‘জামিনই নিয়ম’

প্রতীকী চিত্র

সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ ভারতের বিচারব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিককে নতুন করে সামনে এনে দিল— ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রের ক্ষমতা। বিশেষ করে ইউএপিএ (আনলফুল অ্যাকাটিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট)-এর মতো কঠোর আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে আদালতের এই আত্মসমালোচনামূলক অবস্থান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

দিল্লি দাঙ্গার ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ মামলায় প্রাক্তন জেএনইউ ছাত্রনেতা উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিন প্রত্যাখ্যানের রায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের গুরুতর সংশয় প্রকাশ একটি বিরল ঘটনা। বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে এমন আত্মসমালোচনা সাধারণত দেখা যায় না। কিন্তু এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে বিচারব্যবস্থা নিজেকে সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে— এটাই গণতন্ত্রের শক্তি।

এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— ‘বেল ইজ দ্য রুল, জেল ইজ দ্য এক্সসেপশন’ বা জামিনই নিয়ম, কারাবাস ব্যতিক্রম— এই মৌলিক নীতির পুনরুল্লেখ। বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট করে দেয়, এটি কোনো ফাঁকা স্লোগান নয়, বরং সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত একটি নীতি। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে এই নীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।


ইউএপিএ-র ৪৩-ডি(৫) ধারা কার্যত জামিন পাওয়ার পথকে কঠিন করে তোলে। রাষ্ট্র যদি প্রাথমিকভাবে দেখাতে পারে যে অভিযোগগুলি ‘প্রাইমা ফেসি’ সত্য, তাহলে জামিন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু সমস্যা হল, এই ‘প্রাইমা ফেসি’ মানদণ্ড অত্যন্ত নিম্ন। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে চললেও অভিযুক্ত ব্যক্তি জেলে থেকে যান, অথচ তাঁর অপরাধ এখনও প্রমাণিত হয়নি। এর ফলে বিচার-পূর্ব বন্দিত্ব অনেক সময় শাস্তির রূপ নেয়, যা আইনের মূল দর্শনের পরিপন্থী।

উমর খালিদের ঘটনা এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে একজন ব্যক্তি বিচারাধীন অবস্থায় কারাবন্দি— এটি নিছক আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আদালত নিজেই যখন বলছে যে, দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিলম্বিত হলে সাংবিধানিক আদালত হস্তক্ষেপ করে জামিন দিতে পারে, তখন তা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল আদালতের এই মন্তব্য যে, ইউএপিএ-র মতো আইন ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর সম্পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অজুহাতে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারকে খর্ব করা যায় না। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে, ৪৩-ডি (৫) ধারা সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনস্থ। অর্থাৎ, ব্যক্তিস্বাধীনতা সর্বোচ্চ, আইন তার অধীনেই চলবে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘নির্দোষের অনুমান’ (প্রিজামশন অফ ইনোসেন্স)। বিচারপতি ভূঁইয়ার ভাষায়, এটি একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি। কিন্তু ইউএপিএ-র কঠোর বিধান অনেক ক্ষেত্রে এই নীতিকে দুর্বল করে দেয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন কারাবাস কার্যত সেই ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে, যা ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার বিরোধী।

সুপ্রিম কোর্টের এই আত্মসমালোচনা আসলে বৃহত্তর একটি সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করে— বিচার ব্যবস্থায় বিলম্ব। বিচার যত দেরি হবে, ততই এই ধরনের কঠোর আইনের অপব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়বে। ফলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে, এই রায় একটি সতর্কবার্তাও বটে— রাষ্ট্রের জন্য এবং নিম্ন আদালতগুলির জন্য। শুধু আইনের কঠোর ধারার ওপর নির্ভর করে মানুষের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করা যাবে না। প্রতিটি মামলায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংবিধানের মূল চেতনা মাথায় রাখতে হবে।

সুতরাং সুপ্রিম কোর্টের এই অবস্থান গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। বিচারব্যবস্থা যদি নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে, নিজের ভুল সংশোধনের পথ খুঁজে নিতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে। আইন শুধু শাস্তির হাতিয়ার নয়, এটি ন্যায়ের রক্ষাকবচ— এই বোধটাই আবার সামনে নিয়ে এল এই রায়।

এই প্রেক্ষাপটে এখন প্রয়োজন আইন প্রয়োগে সংযম, বিচারপ্রক্রিয়ায় গতি এবং সর্বোপরি সংবিধানের প্রতি অটল আনুগত্য। তাহলেই ‘বেল ইজ দ্য রুল’— এই কথাটি সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হবে।