ঘর থেকে দূরে: আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

রতন ভট্টাচার্য

তারা ঘর ছাড়ে নিঃশব্দে, প্রায় ভোরের আগে, কোনও বক্তৃতা বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই। কাঁধে ছোট্ট ব্যাগ, ক্ষীণ ব্যাটারির মোবাইল ফোন, ঠিকাদারের নম্বর লেখা কাগজের টুকরো, আর অনিশ্চয়তায় ভরা হৃদয়। এরা আমাদের সময়ের অভিবাসী শ্রমিক— যারা গ্রাম, রাজ্য ও মহাসাগর পেরিয়ে কাজ, মর্যাদা ও বেঁচে থাকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। অথচ ঘর থেকে দূরে তারা প্রায়ই সুযোগ নয়, বরং শত্রুতা, হয়রানি এবং কখনও মৃত্যুরও সম্মুখীন হয়। বাংলা থেকে এবং ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে অভিবাসনের মূল কারণ অর্থনৈতিক। কৃষি আর অতিরিক্ত শ্রমকে শোষণ করতে পারে না। ভাঙা জমি, জলবায়ুর অনিশ্চয়তা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং শিল্পক্ষেত্রের সংকোচন তরুণদের গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করে। অভিবাসন তখন আর পছন্দ নয়, বাধ্যতা। তারা অন্য রাজ্যে যায় বা আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে উপসাগরীয় দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের কিছু অংশে পৌঁছয়, পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের আশায়। কিন্তু সেখানে তারা খুঁজে পায় অনিশ্চিত জীবন— যেখানে তাদের শ্রম দরকার, কিন্তু তাদের উপস্থিতি অপছন্দের।

অভিবাসী শ্রমিকদের হয়রানি ও হত্যার অন্যতম কারণ গভীর সামাজিক কুসংস্কার। অনেক গন্তব্য অঞ্চলে তাদের বহিরাগত হিসেবে দেখা হয়। অভিযোগ ওঠে তারা স্থানীয় চাকরি কেড়ে নিচ্ছে, মজুরি কমাচ্ছে বা সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। রাজনৈতিক বক্তৃতা এই ক্ষোভকে আরও বাড়ায়। ভাষা ও রীতিনীতি না জানায় তারা সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক শোষণ তাদের দুর্বলতাকে আরও বাড়ায়। অধিকাংশ অভিবাসী শ্রমিক অসংগঠিত খাতে কাজ করে, যেখানে কোনও আইনি সুরক্ষা নেই। নির্মাণক্ষেত্র, কারখানা, খামার, গৃহকর্ম ও ছোট কর্মশালায় কোনও লিখিত চুক্তি, নিয়মিত সময় বা নিরাপত্তার মানদণ্ড থাকে না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় অস্বীকার করা হয়, আহত বা মৃত শ্রমিককে সহজেই প্রতিস্থাপন করা হয়। ভাষাগত বাধা তাদের আরও বিচ্ছিন্ন করে। দক্ষিণের রাজ্যে বা বিদেশে গিয়ে তারা আইন, নির্দেশ বা অভিযোগ জানানোর উপায় বোঝে না। ফলে তারা নীরবতাকে বেঁচে থাকার কৌশল বানায়, কিন্তু এই নীরবতা তাদের শোষণের চক্রে আটকে রাখে।
বিদেশে অবস্থা আরও জটিল। অনেক দেশে অভিবাসন আইন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়, শ্রমিকের কল্যাণকে নয়। নির্যাতনের শিকার হলে অভিযোগ জানাতে গেলে আটক বা বহিষ্কারের ঝুঁকি থাকে।


কোভিড-১৯ মহামারী এই ভঙ্গুরতাকে নগ্ন করে দেয়। হঠাৎ লকডাউনে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ, আশ্রয় ও খাদ্য হারায়। দীর্ঘ পদযাত্রায় ক্লান্তি, দুর্ঘটনা ও পুলিশের নির্যাতনে অনেকেই মারা যায়। বিদেশে উচ্চ মজুরির প্রতিশ্রুতি প্রায়ই কঠিন বাস্তবতাকে আড়াল করে। অনেক শ্রমিক এজেন্টদের উচ্চ ফি দিয়ে ঋণে জড়িয়ে পড়ে। পৌঁছনোর পর পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, কাজের সময় বাড়ানো হয়, মজুরি আটকে রাখা হয়। সংকীর্ণ ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা ও মানসিক চাপ সাধারণ ঘটনা। মৃত্যুকে প্রায়ই ‘স্বাভাবিক কারণ’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়, পরিবারের জন্য রেখে যায় অমীমাংসিত শোক। সহিংসতা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও কাঠামোগতও বটে। চাকরি হারানোর ভয়, বহিষ্কারের আশঙ্কা, হয়রানির আতঙ্ক— সব মিলিয়ে তারা চিরস্থায়ী উদ্বেগে ভোগে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা একাকিত্ব বাড়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মানসিক চাপ তাদের মর্যাদাকে ক্ষয় করে।

তবুও তারা চলতে থাকে, কারণ বিকল্প আরও ভয়াবহ— কাজ ছাড়া গ্রামে থেকে যাওয়া। তাদের পাঠানো অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে, শিক্ষা খরচ মেটায়, ঋণ শোধ করে, বৃদ্ধ বাবা-মাকে সহায়তা করে। পুরো গ্রাম তাদের রেমিট্যান্সে বেঁচে থাকে। এই অবিচার দূর করার দায়িত্ব সরকার, নিয়োগকর্তা ও সমাজের। উৎস রাজ্যগুলোকে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে, শিক্ষা উন্নত করতে হবে, এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গন্তব্য রাজ্যগুলোকে শ্রম আইন সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নিয়োগকর্তাদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরির জন্য জবাবদিহি করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমচুক্তিতে মানবাধিকারের অগ্রাধিকার দিতে হবে। সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলো আইনি সহায়তা, সচেতনতা ও জরুরি সহায়তার মাধ্যমে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। অভিবাসী শ্রমিকদের নিজস্ব নেটওয়ার্কও সংহতি ও স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করে। কিন্তু দান বা আন্দোলন কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নয়। অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি আচরণ সমাজের নৈতিক চরিত্র প্রকাশ করে। যারা আমাদের শহর গড়ে, ঘর পরিষ্কার করে, খাবার উৎপাদন করে— তাদের যদি মারধর, অপমান বা হত্যা করা হয়, তবে তা দেখায় মানবমূল্যকে উৎসের ভিত্তিতে মাপা হচ্ছে।

অভিবাসী শ্রমিকরা অনুপ্রবেশকারী নয়; তারা যৌথ সমৃদ্ধির অংশীদার। তারা সহানুভূতি নয়, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার চায়। ঘর থেকে দূরে তারা শুধু ভয় ছাড়া বাঁচার অধিকার চায়। এটি স্বীকার করা করুণা নয়, নৈতিক ও সামাজিক কর্তব্য। যতদিন অভিবাসী শ্রমিকরা সর্বত্র সুরক্ষিত না হবে, ততদিন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ থাকবে— চিরন্তন পথিকদের দুঃখের উপর দাঁড়িয়ে। অভিবাসী শ্রমিকদের সর্বত্র সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নটি আজকের বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বায়নের যুগে শ্রমের চাহিদা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, আর সেই সঙ্গে অভিবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। তারা নির্মাণশিল্প, কৃষি, গৃহস্থালি কাজ, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা দরকার। অনেক দেশে শ্রম আইন থাকলেও অভিবাসী শ্রমিকরা সেই আইনের আওতায় যথাযথভাবে সুরক্ষিত থাকে না। তাদের কাজের সময়সীমা, মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ইতিমধ্যেই অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার জন্য নানা কনভেনশন তৈরি করেছে। কিন্তু অনেক দেশ সেই কনভেনশন অনুমোদন করেনি বা কার্যকর করেনি। তাই আন্তর্জাতিক চাপ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে দেশগুলোকে বাধ্য করতে হবে যাতে তারা অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। দ্বিতীয়ত, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য নিয়োগকর্তাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অভিবাসী শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়া হয়, অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হয়, কিংবা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়। নিয়োগকর্তাদের উচিত শ্রমিকদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা, তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ দেওয়া, এবং তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করা। এজন্য শ্রমিক ইউনিয়ন এবং সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে যাতে তারা অভিবাসী শ্রমিকদের হয়ে কথা বলতে পারে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয়ত, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অনেক সময় স্থানীয় জনগণ অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে, তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে। এই মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। অভিবাসী শ্রমিকরা সমাজের অংশ, তারা অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, তাই তাদের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় সমাজকে বোঝাতে হবে যে অভিবাসী শ্রমিকরা শত্রু নয়, বরং সহযোগী।

অভিবাসী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় তারা বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করে, যেমন নির্মাণশিল্পে উঁচু ভবন তৈরি, খনিতে কাজ, কিংবা রাসায়নিক কারখানায় কাজ। এসব ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া, সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এছাড়া তাদের মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অভিবাসী শ্রমিক পরিবার থেকে দূরে থাকে, একাকিত্বে ভোগে, এবং মানসিক চাপের শিকার হয়। তাদের জন্য কাউন্সেলিং, সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ, এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আয়োজন করা যেতে পারে। অভিবাসী শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় তারা দেশে টাকা পাঠায়, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রেমিট্যান্স ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যাতে তারা সহজে দেশে টাকা পাঠাতে পারে। এই সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, অভিবাসী শ্রমিকদের সর্বত্র সুরক্ষিত রাখার জন্য বহুমাত্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এটি মানবিক দায়িত্ব, সামাজিক দায়িত্ব, এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব। অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষিত রাখলে আমরা একটি ন্যায়সঙ্গত, মানবিক, এবং উন্নত বিশ্ব গড়ে তুলতে পারব।