যুবকটি আমার পাশ দিয়ে উল্টো দিকে চলে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল একটি অত্যন্ত নোংরা কথা! সম্ভবত আরও কিছু বলতে বলতে গেল, ঠিক শুনতে পাই নি। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম কাছাকাছি কোন লোক নেই। মনে হলো, কথাটা বোধহয় আমার উদ্দেশ্যেই বলেছে। ওকে আমি আগেও এলাকায় দেখেছি। মুখ চিনি, নাম জানি না। সন্দিহান হয়ে, ঘুরে ওর দিকে একটু জোরে হেঁটে গেলাম। পাশে এসে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী আজেবাজে কথা বলছ? কেন বলছ?’ যুবকটি তখন পকেট থেকে তার মোবাইল ফোনটা বের করে আমাকে দেখিয়ে, আবার হাঁটা লাগালো। কোন কথা বললো না।
এর থেকে পাঠক কী বুঝছেন জানি না, আমি বুঝলাম এ এক আধুনিক ‘যন্ত্রমানব’। ইঙ্গিতে যা বোঝানোর বুঝিয়ে গেল। যার অর্থ সে ফোনে কারও সাথে কথা বলছিল, আমার সঙ্গে নয়। এখন রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে, বাস-ট্রেনে সবরকম যানবাহনে এইসব যন্ত্রমানবের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। পকেটে ফোন, কানে হেডফোন বা তারহীন ইয়ারবাড, কখনও সেগুলো দৃশ্যমান, কখনও চুলের আড়ালে অদৃশ্য। তাতে অবিরত চলছে কথা বলা, গান শোনা, সিনেমা, সিরিয়াল বা খেলা দেখা। চারপাশের রক্ত-মাংসের পৃথিবী থেকে তারা যেন এক অদৃশ্য দেওয়ালে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
ছোটরাও আজ এই মরণনেশা থেকে বাদ নেই। বরং বড়দের থেকে তারা মোবাইল চালাতে অতি দক্ষ। এজন্য অনেক অভিভাবক বেশ গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘আমার ছেলে বা মেয়ে মোবাইল সম্বন্ধে এত জানে, যা আমরা এখনো রপ্ত করতে পারিনি।’ অথচ তাঁরা বুঝছেন না, এটি গর্বের নয়, চরম আশঙ্কার কথা।
এখন ঘরে ঘরে এমন অনেক শিশু সন্তানের সন্ধান পাওয়া যাবে যারা মোবাইলের পর্দায় কার্টুন বা রিলস না দেখলে এক গ্রাস ভাতও মুখে তোলে না। অনেক একক সংসারে মা-বাবা দুজনেই চাকুরিজীবী হওয়ার কারণে সন্তানকে দেওয়ার মতো সময়ের বড্ড অভাব। তাই শিশুদের দুষ্টুমি বন্ধ করার জন্য, তাদের শান্ত রেখে খাওয়ানোর জন্য মা-বাবার কাছে মোবাইল এখন একটা মোক্ষম অস্ত্র। এতে কাজগুলো সহজ হয়ে যায়, সময় কম লাগে। কিন্তু এর ফলে আমরা যে পরবর্তী প্রজন্মকে এক মারাত্মক মোবাইল আসক্তিতে ঠেলে দিচ্ছি, সেই ধারণা অভিভাবকদের মনে একটুও ঘা দিচ্ছে না! মনোবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ডিজিটাল ড্রাগ’। বিভিন্ন সিনেমা ও গবেষণায় খুব সুন্দর করে দেখানো হয়েছে যে, এই আসক্তি শিশুদের কতটা ক্ষতি করছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে শিশুদের কথা বলা শিখতে দেরি হচ্ছে , চোখ ও কানের ক্ষতি হচ্ছে এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। অথচ বারবার প্রচার করেও অভিভাবকদের সচেতন করা যাচ্ছে না। আসলে মোবাইল আমাদের বর্তমান সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, এর থেকে যেন মুক্তি নেই! অদৃশ্য মোবাইলে কথা বলার সময় কেউ যদি সামনে থাকেন, তিনি মনে করতেই পারেন কথাগুলো তাঁকেই বলা হচ্ছে। এরকম ভুল বোঝাবুঝি এবং অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা বোধহয় আজকাল অনেকেরই হচ্ছে।
প্রযুক্তির উন্নতিতে যন্ত্রের দাপট যত বাড়ছে, সমাজে যন্ত্রমানব-মানবীদের সংখ্যা ততই বাড়ছে। কিছুকাল আগেও বাসে, ট্রামে, ট্রেনে বা প্লেনে পাশের সহযাত্রীর সাথে মানুষ আলাপ-পরিচয় করত। নিজের ঘরের তৈরি খাবার ভাগ করে খেত। কখনো কখনো সেই পরিচয় গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হতো, যা পরবর্তীতে একটা স্থায়ী পারিবারিক সম্পর্কে রূপ নিত। সহযাত্রীর সঙ্গে প্রেম ও পরে বিয়ে হয়েছে, এমন ঘটনাও সমাজে কম নেই।
কিন্তু এখন ‘সহযাত্রী৩ কথাটি অভিধানে আছে বটে, কিন্তু আলাপ-পরিচয়ের বালাই নেই। সবার মুখ বন্ধ, কান বন্ধ। প্রয়োজনের তাগিদে যান্ত্রিকভাবে তারা যানবাহনে উঠছে, জায়গা থাকলে বসছে, না থাকলে দাঁড়িয়ে থাকছে, ন্তব্যস্থল এলে রোবটের মতো নেমে যাচ্ছে। কাদের সাথে রাস্তাটুকু এলাম, কারা আমার সহযাত্রী ছিল, তারা কোনও বিপদে পড়েছে কি না, এসব জানার বিন্দুমাত্র কৌতুহল কারও নেই। সবাই নিজেকে নিয়ে, নিজের ভার্চুয়াল জগৎ নিয়ে ব্যস্ত।
সামাজিকতা, মানুষে মানুষে মেলামেশা, কথাবার্তার আদান-প্রদান, ভাব ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ ক্রমাগত কমছে। এখনকার মানুষকে রাস্তায় কোনো ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে গেলেও অনেকে কানে গোঁজা ইয়ারফোনের কারণে শুনতে পায় না। আর সহযাত্রীর সঙ্গে নিজে থেকে কথা বলতে গেলে অনেক সময় বিরক্তি ও সন্দেহের প্রকাশ দেখে বিস্মিত হতে হয়, সংকুচিত হতে হয়। শুধু তাই নয়, কান বন্ধ করে রাস্তা পার হওয়া বা টোটো, অটো ও মোটরসাইকেল চালানোর জন্য প্রতিদিন কান পাতলেই শোনা যায় নির্মম দুর্ঘটনার খবর। ট্রেনের লাইনে হেডফোন কানে হেঁটে যাওয়ার সময় পেছন থেকে আসা ট্রেনের হুইসেল না শুনতে পেয়ে কত তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। যন্ত্রের দাস এই লোকগুলোকে যন্ত্রমানব ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!
বর্তমান যুবসমাজ, যারা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে আইটি সেক্টরে চাকরি করছে, তাদের জীবনযাত্রার দিকে লক্ষ্য করলে এক অদ্ভুত একাকীত্ব চোখে পড়ে। তাদের অধিকাংশই সকাল ন’টায় ঘুম থেকে উঠে আধঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে গন্তব্যের দিকে রওনা হয়। সারাদিন এসি ঘরের ভেতরে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ নিয়ে রোবটের মতো কাজ। বাড়ি ফেরে রাত ন’টা বা দশটায়। এসে আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ে কিছু জরুরি মেইল বা কাজ শেষ করার জন্য। সংসারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে একটু মন খুলে কথা বলা বা আত্মিক সম্পর্ক তৈরির কোন সুযোগই এদের নেই। আবার যাদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজের সুবিধা আছে, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। তাদের কাজের কোনও নির্দিষ্ট সময় থাকে না, অনেক সময় ঠিকমতো খাওয়ার সময়টুকুও জোটে না। এরা বাড়িতে কোনও আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের আনাগোনা একদম পছন্দ করে না। জোরে কথাবার্তা বা যেকোন শব্দ ওদের ভীষণ অপছন্দ।
একটা বদ্ধ ঘরে দরজা-জানালা বন্ধ করে ল্যাপটপ ও মোবাইল নিয়েই কাটে ওদের দিন ও রাত। কখনও ভার্চুয়াল মিটিং, কখনো রিপোর্ট পাঠানো, কখনও ক্লায়েন্টের সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত কথা বলা, এইসব নিয়েই ওদের বৃত্ত। গভীর রাত পর্যন্ত ওদের স্ক্রিনের আলো জ্বলে। কোনো সুস্থ বিনোদন নেই। বাড়ির অতি আপনজনের সঙ্গে বসে একসঙ্গে চা খাওয়া বা একটু আড্ডার কোনও সুযোগ নেই।
আজকাল অনেক স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির পড়ুয়ারাও এইরকম অনলাইন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাত জেগে গেম খেলা বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করার কারণে ওরা ভোরের আলো দেখতে পায় না। পাখিদের কলকাকলিতে ওদের ঘুম ভাঙে না। প্রকৃতি প্রেম থেকে এরা আজ অনেক দূরে। শরৎকালের শিউলি ফুল, বর্ষার মাটির গন্ধ কিংবা শীতের মিষ্টি রোদ, এদের কাছে শুধু ফেসবুকের দেওয়ালে পোস্ট করার ছবি মাত্র।
মদখোর ব্যক্তিকে ব্যঙ্গ করে সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘লোকটি মদ খায় না, মদই ওকে খেয়ে ফেলেছে।’ চোখের সামনে বর্তমান প্রজন্মের এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আজ মনে হয়, ২এরা মানুষ বটে, কিন্তু যন্ত্র ওদের আস্ত গিলে ফেলেছে।’ তাই আজ ওরা রক্ত-মাংসের যন্ত্রমানব।
আমরা কি যন্ত্রমানব হয়ে উঠছি?
3d rendering humanoid robot with ai text in ciucuit pattern
পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে গতিশীল, আধুনিক ও আরামদায়ক করলেও তার আড়ালে আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের আদি ও অকৃত্রিম ‘মনুষ্যত্ব’। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, মানুষ একাকী বেঁচে থাকতে পারে না, মানুষ সামাজিক জীব। আর সামাজিকতার মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক কুশল বিনিময়, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, পাশে থাকা এবং সাহচর্য। যন্ত্র আমাদের জীবনের একটা কাজের অংশ হতে পারে, কিন্তু জীবনের বিকল্প বা জীবনসঙ্গী হতে পারে না। আজকের এই ‘যন্ত্রমানব’ হওয়ার আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের সচেতনভাবে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে হবে। প্রযুক্তি যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, আমরা যেন প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করি। দিনের কিছুটা সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রেখে পরিবারের সঙ্গে মুখোমুখি আড্ডা দেওয়া, পাশের মানুষটির সঙ্গে কথা বলা কিংবা একটু প্রকৃতির সান্নিধ্যে হেঁটে আসা আজ আর বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। মা-বাবারও উচিত সন্তান কত ভালো মোবাইল চালাতে পারে বা কত দ্রুত গেমের লেভেল পার করতে পারে তা নিয়ে গর্ব না করে, সে কতখানি সামাজিক হচ্ছে, চারপাশের মানুষের প্রতি কতখানি সংবেদনশীল হয়ে উঠছে, সেদিকে কড়া নজর দেওয়া। সন্তানকে ফোনের স্ক্রিন না দিয়ে নিজের মূল্যবান সময় দিন, তাকে মাঠে গিয়ে খেলতে উৎসাহিত করুন, গল্পের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করান। মনে রাখতে হবে, এই সুন্দর পৃথিবীটা কেবল পিক্সেল, ডেটা আর মেগাবাইটের যান্ত্রিক হিসেব দিয়ে তৈরি নয়; এটি তৈরি হয়েছে মানুষের ভালোবাসা, রক্ত-মাংসের সম্পর্ক আর অনুভূতির আলগা সুতোয়। যন্ত্র যেন আমাদের গ্রাস করতে না পারে, বরং যন্ত্রকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করেই যেন আমরা আরও বেশি মানবিক হয়ে উঠতে পারি, সেই সংকল্পই হোক বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, আমরা হয়তো বিজ্ঞানের হাত ধরে সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছাবো ঠিকই, কিন্তু সেখানে কোন প্রাণবন্ত ‘মানুষ’ খুঁজে পাওয়া যাবে না; চারপাশ জুড়ে থাকবে কেবল কতগুলো অনুভূতিহীন, আত্মকেন্দ্রিক রক্ত-মাংসের রোবট।