ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন ভ্যাকসিন ‘কিউডেঙ্গা’-র অনুমোদন

Image: ANI

ডেঙ্গু এখন আর কেবল শহরের একটি মরসুমি সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে ভারতের জনস্বাস্থ্যের এক বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে, হাসপাতাল ভরে যায়, আর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন ভ্যাকসিন ‘কিউডেঙ্গা’-র অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

কিন্তু শুধু ভ্যাকসিন এলেই সমস্যা মিটে যাবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং এই ভ্যাকসিন কীভাবে সবার কাছে পৌঁছবে, বিশেষ করে যাঁরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।ডেঙ্গু রোগটি ছড়ায় এডিস প্রজাতির মশার মাধ্যমে। আগে এই মশা মূলত শহরাঞ্চলে বেশি দেখা যেত, কিন্তু এখন তা আধা-শহর ও গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে শুধু মশা নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত পদ্ধতি– যেমন, জল জমতে না দেওয়া বা ফগিং— এখন আর যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনসংখ্যার চাপ। এই অবস্থায় একটি কার্যকর ভ্যাকসিন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সহায়ক হতে পারে।

তবে ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন তৈরি করা সহজ কাজ নয়। ডেঙ্গুর চারটি আলাদা ধরন বা সেরোটাইপ রয়েছে। একবার ডেঙ্গু হলে পরবর্তীতে অন্য ধরনের সংক্রমণ হলে রোগটি আরও গুরুতর হতে পারে। তাই একটি ভ্যাকসিনকে চার ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধেই সমানভাবে কাজ করতে হয়, এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে ‘ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া’ নামে একটি ভ্যাকসিন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে ফিলিপাইনে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকদের আরও সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।


‘কিউডেঙ্গা’ সেই দিক থেকে একটি নতুন আশা জাগায়। এটি এমনভাবে তৈরি, যাতে আগে ডেঙ্গু হয়েছে কি না তা পরীক্ষা না করেই এটি দেওয়া যায়। কিন্তু তাতেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব সেরোটাইপের বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা সমান নয়। বিশেষ করে ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪-এর ক্ষেত্রে সুরক্ষা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। ভারতে ডিইএনভি-২ বেশি দেখা গেলেও, ডিইএনভি-৩-এর প্রকোপ বাড়ছে। যদি ভবিষ্যতে এই ধরনের সংক্রমণ বাড়ে, তাহলে ভ্যাকসিনের প্রভাব প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এই ভ্যাকসিনটি দুই ডোজে নিতে হয়, তিন মাসের ব্যবধানে। প্রথম ডোজ নেওয়ার পরেই পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না। ফলে কেউ যদি বর্ষার শুরুতে প্রথম ডোজ নেন এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমিত হন, তাহলে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। বিশেষ করে যাঁরা আগে কখনও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হননি, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি।এখানেই আসে বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ভারতের মতো দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজের খোঁজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যান।

এই ভ্রাম্যমাণ শ্রমজীবী মানুষের কাছে দুই ডোজের ভ্যাকসিন সঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়া সহজ নয়। অনেকেই হয়তো প্রথম ডোজ নেবেন, কিন্তু দ্বিতীয় ডোজ না-ও নিতে পারেন। এতে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যাবে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— দাম। এই ভ্যাকসিনটি যদি খুব দামি হয়, তাহলে যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, যেমন শহরের বস্তি এলাকায় বসবাসকারী মানুষ, তারা এটি নিতে পারবেন না। অথচ তারাই ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় শিকার। খারাপ ড্রেনেজ, জমে থাকা নোংরা জল, ঘনবসতি— সব মিলিয়ে এই এলাকাগুলিতেই মশার বংশবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়।

তাই সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো, ভ্যাকসিনটিকে সস্তা করে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা। প্রয়োজনে সংস্থার সঙ্গে দর কষাকষি করতে হবে, ভর্তুকি দিতে হবে, অথবা সরকারি টিকাকরণ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু অনুমোদন দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বাস্তবে কতজন মানুষ এই ভ্যাকসিন পাচ্ছেন, সেটাই আসল মাপকাঠি।একই সঙ্গে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। মানুষকে বুঝতে হবে, ভ্যাকসিন নিলেই সব শেষ নয়। মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা জল সরানো—এই সব ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

মনে রাখতে হবে, কিউডেঙ্গা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু এটি কোনো জাদুকাঠি নয়। সঠিক পরিকল্পনা, সুলভ দাম, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা— এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। না হলে ভ্যাকসিন থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষ সুরক্ষার বাইরে থেকে যাবেন, আর ডেঙ্গুর দাপট কমবে না।