সন্ত্রাসবিরোধী ‘প্রহার’

কেন্দ্র সরকার দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সন্ত্রাসবিরোধী নীতি ‘প্রহার’ প্রকাশ করেছে। এই নীতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এখনকার সন্ত্রাস শুধু সীমান্ত পেরিয়ে আসা হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আকাশপথে ড্রোন, ইন্টারনেটের আড়াল, গোপন অর্থ লেনদেন— সব মিলিয়ে হুমকির ধরন বদলে গিয়েছে। তাই মোকাবিলার পথও বদলাতে হবে।

নীতিপত্রে বলা হয়েছে, ভারত স্থল, জল ও আকাশ— তিন দিক থেকেই সন্ত্রাসের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, বিমানবন্দর, বন্দর, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও পারমাণবিক শক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিকে সুরক্ষিত রাখার মতো ক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে। কারণ আজকের সন্ত্রাসীরা জানে, দেশের মেরুদণ্ডে আঘাত করলে সাধারণ মানুষের জীবনই অচল হয়ে পড়বে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা নীতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসকে কোনও ধর্ম বা জাতির সঙ্গে জুড়ে দেখা হবে না। এই অবস্থান খুবই প্রয়োজনীয়। কারণ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যদি সমাজে বিভাজন তৈরি হয়, তাহলে সেটাই হবে জঙ্গিদের বড় সাফল্য। তবে একই সঙ্গে সীমান্তপারের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতে আল-কায়দা ও আইসিস (ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া)-এর মতো সংগঠন ভারতের বিরুদ্ধে হামলার চেষ্টা করেছে, এই বাস্তবতাও নথিতে উঠে এসেছে।


এখনকার সন্ত্রাসের বড় শক্তি প্রযুক্তি। ছোট আকারের উড়ন্ত যন্ত্র ব্যবহার করে অস্ত্র বা মাদক পৌঁছে দেওয়া, গোপন বার্তা আদানপ্রদান, ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে পরিচয় লুকিয়ে যোগাযোগ— এসবই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানো ও তরুণদের ভুল পথে টানার চেষ্টাও হচ্ছে। তাই কেবল কড়া নজরদারি নয়, প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।

নীতিতে রাসায়নিক, জৈব বা পারমাণবিক উপাদানের অপব্যবহারের আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। যদিও এমন ঘটনা বিরল, তবু সতর্ক থাকা ছাড়া উপায় নেই। ছোট একটি গোষ্ঠীও যদি বিপজ্জনক উপাদান হাতে পায়, তার ক্ষতি বড় হতে পারে। তাই বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই নীতির আরেকটি বড় দিক হলো যুবসমাজকে নিয়ে ভাবনা। বলা হয়েছে, কিছু জঙ্গি গোষ্ঠী দেশের তরুণদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। একবার কেউ চিহ্নিত হলে তার ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে— প্রথমে বোঝানো, প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ। সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি, ধর্মীয় নেতা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু শাস্তি নয়, সংশোধনের পথও খোলা রাখতে চাওয়া হয়েছে।

কারাগারের ভেতরেও যেন চরমপন্থা ছড়িয়ে না পড়ে, সে দিকেও নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অনেক সময় কঠোরপন্থী বন্দিরা দুর্বল মানসিকতার অন্যদের প্রভাবিত করতে পারে। তাই সতর্কতা ও পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচি— দুটিই দরকার।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, মামলা নথিভুক্ত করা থেকে শুরু করে বিচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আইনজ্ঞদের যুক্ত করা। এতে প্রমাণভিত্তিক শক্ত মামলা গড়ে তোলা সহজ হবে এবং আদালতে তা টিকবে। সন্ত্রাস দমনে কঠোরতা যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন সঠিক ও ন্যায্য প্রক্রিয়া।

আজকের দিনে সন্ত্রাস কোনও এক দেশের সমস্যা নয়। অনেক সময় বিদেশে বসে পরিকল্পনা হয়, আর স্থানীয় চক্র তা কার্যকর করে। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, তথ্য আদানপ্রদান এবং সীমান্তে সতর্কতা, এসবই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে ‘প্রহার’ একটি সতর্কবার্তা এবং দিকনির্দেশ। তবে নীতি কাগজে থাকলেই হবে না, বাস্তবে তার সঠিক প্রয়োগই আসল কথা। নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও সমান জরুরি।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অস্ত্রের নয়, মননেরও। তরুণদের সামনে যদি শিক্ষা, কাজ ও সম্মানের পথ খোলা থাকে, তবে বিভ্রান্তির জায়গা কমে যায়। শক্ত হাতে নিরাপত্তা আর নরম হাতে সমাজ— এই দুইয়ের ভারসাম্যেই সাফল্য উঠে আসে। ‘প্রহার’ সেই ভারসাম্য কতটা রক্ষা করতে পারে, তা নির্ভর করবে তার ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ, স্বচ্ছতা এবং সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর। সময়ই তার প্রকৃত পরীক্ষা নেবে।